সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের কারণ ও গুরুত্ব আলোচনা করো।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের কারণ ও গুরুত্ব ঃ


ভূমিকা: ভারতের জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বশেষ বৃহৎ মরিয়া গণ প্রচেষ্টা হল ভারত ছাড়ো আন্দোলন। গান্ধিজি ব্রিটিশ সরকারের উদ্দেশ্যে 'হরিজন' পত্রিকায় লেখেন (১৯৪২ খ্রি., ২৪ মে) – ভারতকে ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দাও, না হলে তাকে নৈরাজ্যের হাতে ছেড়ে চলে যাও (Leave India to God. If that is too much, then leave her. to anarchy')।


পটভূমি / কারণ 

[1] ক্রিপস প্রস্তাবের ব্যর্থতা : ক্রিপস প্রস্তাবের ব্যর্থতায় ভারতবাসী অনুভব করে যে—ইংরেজ সরকার কখনোই স্বেচ্ছায় তাদেরকে স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেবে না। তাই স্বাধীনতা পেতে হলে সরাসরি ইংরেজদের সঙ্গে সংগ্রামে লিপ্ত হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।

[2] ব্রিটিশ দমননীতি : ব্রিটিশ সরকার তার সামরিক বাহিনী দ্বারা ভারতবাসীর ওপর যে অকথ্য নির্যাতন, অত্যাচার চালিয়ে আসছিল তাতে ভারতীয়রা বিক্ষুদ্ধ হয়ে মুক্তির পথ খুঁজতে শুরু করেছিল। ব্রিটিশরা দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয়দের কালা আদমি বলে উপেক্ষা করে আসার পাশাপাশি ভারতীয় নারীদের প্রতি অশালীন আচরণ শুরু করলে ভারতীয়দের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে।

[3] দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় খাদ্যের জোগান কম হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। চালের খুচরো দাম বেড়ে হয় ৩০-৫০ টাকা প্রতি মণ, কেরোসিন ও কাপড়, ওষুধপত্র প্রভৃতি দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ে। এই সুযোগে কালোবাজারি ও মজুতদাররা ফায়দা তোলার চেষ্টা করে। ফলে ব্রিটিশের ওপর ভারতবাসীর বিশ্বাস সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়—তারা ব্রিটিশ শাসনের অবসানের লক্ষ্যে সর্বশেষ গণ আন্দোলনে শামিল হয়।

[4] স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা : স্বাধীনতার জন্য ভারতবাসী আর বিন্দুমাত্র অপেক্ষা করতে রাজি ছিল না। অসহযোগ, আইন-অমান্য আন্দোলন ভারতবাসীর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্রতর করে তুলেছিল। ভারতবাসী চেয়েছিল শেষবারের মতো এক সর্বভারতীয় গণ আন্দোলন গড়ে তুলে ব্রিটিশের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে। নিতে। তাই ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠী লিখেছেন —“ভারত ছাড়ো আন্দোলনে গান্ধি যতটা নেতা, ততটাই জনগণের ইচ্ছার দাস।”

[5] শীর্ষ নেতাদের জঙ্গি মনোভাব : ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে দেশের শীর্ষনেতাদের জঙ্গি মানসিকতা, বিশেষত গান্ধিজির অনমনীয় মনোভাব আর একটি গণ আন্দোলনের পটভূমি রচনা করেছিল। গান্ধিজি দেশবাসীর উদ্দেশে 'করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে' মন্ত্র ঘোষণা করেন। জওহরলাল এ প্রসঙ্গে বলেছেন—গান্ধিজিকে ইতিপূর্বে আর কখনও এতটা ব্রিটিশবিরোধী দেখা যায়নি।

[6] জাপানি আক্রমণের সম্ভাবনা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রণাঙ্গনে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে জাপানের অগ্রগতি ভারতবাসীর মনে যুগপৎ এক আশা ও আশঙ্কার জন্ম দেয়। তারা আশঙ্কা করে এবার ব্রিটিশ শাসিত ভারতেও জাপান আক্রমণ করবে। ব্রিটিশের স্বার্থরক্ষার যুদ্ধে মরবে সাধারণ ভারতবাসী। এই আশঙ্কায় ভারতীয় নেতারা এক ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। মৌলানা আজাদের মতে, জাপানি আক্রমণের সম্ভাবনাই গান্ধিজিকে এক গণ আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেয়।


ভারত ছাড়ো আন্দোলনের গুরুত্ব / তাৎপর্য 

ভারত ছাড়ো আন্দোলন ছিল ভারতে ব্রিটিশ শাসন অবসানের অন্তিম পদক্ষেপ। “১৯৪২-এর বিদ্রোহ বাস্তবিকই ছিল সৈনিকের যুদ্ধ। সেনাপতি ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত; কিন্তু সৈনিকগণের ভূমিকা ছিল গৌরবজনক। কারণ তাঁরা দেশের স্বাধীনতার জন্য শহিদের ন্যায় জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।” ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের এই মন্তব্য থেকেই ভারত ছাড়ো আন্দোলনের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। যেসব কারণে এই আন্দোলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলি হল—

[1] স্বাধীনতার অজেয় সংকল্প: ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়। ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ভারতবাসীর ঘনীভূত ক্ষোভ ও তা থেকে মুক্তির জন্য অজেয় সংকল্প এই বিদ্রোহে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।

[2] সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা : মুসলিম লিগ এই আন্দোলনে যোগ না দিলেও আন্দোলন চলাকালে কোথাও কোনো সাম্প্রদায়িক বিরোধ বাধেনি। তাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ছিল এই আন্দোলনের এক বিশাল সম্পদ।

[3] জাতীয় বিপ্লব : বিয়াল্লিশের আন্দোলনের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন—নেতা নেই, সংগঠন নেই, উদ্যোগ আয়োজন কিছু নেই, কোনো মন্ত্ৰবল নেই, অথচ একটা অসহায় জাতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মপ্রচেষ্টার আর কোনো পথ না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠল—এ দৃশ্য বাস্তবিকই বিস্ময়ের। এই আন্দোলনকে তিনি ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বড়োলাট লর্ড লিনলিথগো-ও এই আন্দোলনকে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের পর সবচেয়ে বড়ো বিদ্রোহ বলে উল্লেখ করেছেন।

[4] ব্রিটিশ শাসনের মৃত্যুঘণ্টা : অধ্যাপক সুমিত সরকারের মতে—বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের অংশগ্রহণের ফলেই আগস্ট বিদ্রোহ এক দুর্দমনীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। এই অতুলনীয় গণবিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর মনে এই বোধ সুস্পষ্টভাবেই জাগিয়ে দিয়েছিল যে, ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান আর বেশি দূরে নেই। ভারতের স্বাধীনতা লাভ একটি অবধারিত ব্যাপার। বাকি কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর কীভাবে হবে বা স্বাধীনতা লাভের পর ভারতের সরকার কীভাবে সংগঠিত হবে সেটা ঠিক করা। তাই একথা বলা হয় যে, বিয়াল্লিশের আন্দোলন বা ভারত ছাড়ো আন্দোলন ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মৃত্যুঘণ্টাধ্বনি শুনিয়েছিল।

[5] স্বাধীনতা অর্জনের ভিত্তিস্থাপন : বিয়াল্লিশের আন্দোলনের গভীরতা ও ব্যাপকতা যে ভারতের স্বাধীনতার ভিত্তিভূমি রচনা করেছিল, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। একদিকে যখন সুভাষচন্দ্রের সশস্ত্র বিপ্লবী তৎপরতায় ভারতের ব্রিটিশ সরকার আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল, ঠিক তখনই 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের তীব্রতা সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছিল।

[6] ব্রিটিশের বোধোদয়: ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ভারতবাসীর যে তীব্র স্বাধীনতাকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়, তা ব্রিটিশের বোধোদয় ঘটায়। ব্রিটিশ সরকার অনুভব করে যে এবার তাদের ভারত ছাড়ার সময় হয়েছে। আন্দোলনের গভীরতা উপলব্ধি করে লিনলিথগোর পরবর্তী বড়োলাট লর্ড ওয়াভেল লিখেছিলেন, যুদ্ধ শেষ হলে ভারতকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হওয়ার আগেই ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা উচিত।

[7] কংগ্রেসি মর্যাদার পুনঃপ্রতিষ্ঠা : আন্দোলন চলাকালীন মহাত্মা গান্ধির অনশন জাতির হৃদয়ে কংগ্রেসের মর্যাদাকে পুনরায় অধিষ্ঠিত করে। এই আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই সংশয়াতীতভাবে প্রমাণিত হয় কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা ব্যাপক এবং সর্বাত্মক।

[৪] নতুন নেতৃত্বের আবির্ভাব : আন্দোলন পরিচালনার প্রয়োজনে নতুন নতুন নেতার আবির্ভাবের মধ্যে দিয়ে ভারতবাসীর সংগ্রামী শক্তি ও স্বাধীনতা লাভের ইচ্ছা যে কত প্রবল ও প্রচণ্ড তাও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।

[9] ভারতের স্বাধীনতা সুনিশ্চিতকরণ : সর্বোপরি, মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে এই সংগ্রাম অহিংসা নীতিকে সম্পূর্ণভাবে মেনে চলতে ব্যর্থ হলেও, ভারতীয় স্বাধীনতাকে সুনিশ্চিত করেছিল। এই দিকটি বিবেচনা করলে আগস্ট আন্দোলন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় অধ্যায়।

[10] গণ আন্দোলন হিসেবে : ভারত ছাড়ো আন্দোলন প্রকৃত অর্থেই হয়ে উঠেছিল সর্ববৃহৎ জাতীয় গণ আন্দোলন। এই আন্দোলনে শ্রমিক ও কৃষকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি স্বতঃস্ফূর্তভাবে শামিল হয়ে একে গণ আন্দোলনের রূপ দান করে। নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটিও এই আন্দোলনকে ‘গণযুদ্ধ' আখ্যা দিয়েছিল।

উপসংহার : ভারত ছাড়ো আন্দোলনের গুরুত্ব এখানেই যে—এই আন্দোলনই ঠিক করে দেয়, ভারতবাসী স্বাধীনতা পাচ্ছে। কবে সেই স্বাধীনতা আসছে শুধু সেই প্রশ্নের উত্তরটুকুই বাকি থাকে। প্রকৃতপক্ষে এই আন্দোলনের তীব্রতাকে ভয় পেয়েই ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল যে, ভারতবাসীকে এবার স্বাধীনতা প্রদান করতে হবে।




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অবশিল্পায়ন কি ? ঔপনিবেশিক ভারতে অবশিল্পায়নের কারণ ও ফলাফল লেখো ।

অবশিল্পায়নঃ        অবশিল্পায়ন বলতে বোঝায় শিল্পায়নের বিপরীত বা শিল্পের অধোগতি। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনধীন ভারতের চিরাচরিত ও ঐতিহ্যশালী হস্তশিল্প-কুটিরশিল্পের ধ্বংস সাধনই মূলত অবশিল্পায়ন। সব্যসাচী ভট্টাচার্যের মতে যদি দেশের মানুষ শিল্প-কর্ম ছেড়ে চাষ-আবাদে জীবিকা অর্জন শুরু করে অথবা জাতীয় কৃষিজ ও অংশ বাড়তে থাকে এবং শিল্পজ অংশ কমতে থাকে তাকে অব-অবশিল্পায় বলে। অবশিল্পায়নের ফলে ভারতের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের অবশিল্পায়ন সম্পর্কে প্রথম পর্বে দাদাভাই নাও রোজি, রমেশ চন্দ্র দত্ত, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনীপাম দত্ত জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনী পামদত্ত, গ্যাডগিল, বি.ডি. বসু, নরেন্দ্রকৃয় সিংহ, বিপান চন্দ্র, অমিয় বাগচি প্রমুখ ঐতিহাসিক আলোচনা করেছেন। অব-শিল্পায়নের কারণঃ (১) কাঁচামালের রপ্তানি: ভারতীয় শিল্পের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে কাঁচামাল রপ্তানি শুরু হয়। ভারত ইংল্যান্ডের কলকারখানার খোলা বাজার ও কাঁচামাল সরবরাহের উৎসে পরিণত হয়। ভারত থেকে তুলো, নীল, কফি, চা, রেশম প্রভৃতি ইং...

জোটনিরপেক্ষ নীতি কী ? জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব লেখো।

জোটনিরপেক্ষ নীতিঃ     দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে একদিকে সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী বা সমাজতান্ত্রিক জোট, অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়। এই দুই জোটের কোনোটিতেই যোগ না দিয়ে, স্বাধীনভাবে উভয় জোটের সঙ্গেই বন্ধুত্ব বা সমদূরত্ব বজায় রেখে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার নীতি জোটনিরপেক্ষ নীতি নামে পরিচিত। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের কারণ বা উদ্দেশ্য ঃ    মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী জোট ও সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী জোটের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত ‘ঠান্ডা লড়াই'-এর আর্বত থেকে নিজেকে দূরে রেখে, জাতীয় স্বার্থ ও নবলব্ধ স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য ভারত জোটনিরপেক্ষ বিদেশনীতি গ্রহণ করে। ভারতে জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের কারণগুলি হল— [1] ভৌগোলিক সুরক্ষা : এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে এমন একটা জায়গায় ভারতের অবস্থান যা তাকে মধ্যপ্রাচ্য। ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী দেশে পরিণত করেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চিন, ব্রহ্মদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশি...

চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপ সম্পর্কে আলোচনা করো।

অথবা, রাজরাজ ও প্রথম রাজেন্দ্র চোলের নেতৃত্বে নৌ সাম্রাজ্যের বিস্তারের ইতিহাস লেখো। চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপঃ       প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে চোল যুগ সামুদ্রিক কার্যকলাপের জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। রাজরাজের শাসনকাল থেকে প্রথম কুলোতুঙ্গের শাসনকাল পর্যন্ত প্রায় ১৩৫ বছর চোল রাজারা সামুদ্রিক সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। ঐতিহাসিক পানিক্করের মতে, প্রাচীন ভারতের শুধু চোল রাজারাই সামুদ্রিক শক্তির বিস্তারে উৎকর্ষ দেখিয়েছিলেন। চোল রাজাদের নৌ সাম্রাজ্য বিস্তারের পিছনে বাণিজ্যের বিস্তার, উপনিবেশ স্থাপন, আরব আক্রমণ প্রতিহত করা প্রভৃতি বিষয়গুলি মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।        রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল পিতা-পুত্র চোলদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় চোল ইতিহাস শতাব্দীকাল ব্যাপী ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। চোল রাজ্য ছিল একটি ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাজ্য, যাকে রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল ভারতের মূল ভূখন্ড ছাড়িয়ে তাদের নৌবহরের দাপটে বঙ্গোপসাগরকে এক বিরাট সামুদ্রিক সাম্রাজ্যে পরিণত করে। তাই বলা যায় তার...

১৫২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল-আফগান দ্বন্দ্বের বিবরণ দাও।

মুঘল-আফগান দ্বন্দ্ব:      ভারতে মুঘল শক্তির উত্থান ও বিকাশের সঙ্গে মুঘল আফগানি দ্বন্দ্বের সমান্তরাল অবস্থান দেখা যায়। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল আফগান দ্বন্দ্ব চলতে থাকে।      খানুয়ার যুদ্ধ: ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে মেবারের রানা সংগ্রাম সিংহের সঙ্গে বাবরের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধে রানা সংগ্রাম সিংহ পরাজিত হন। এই যুদ্ধে রাজপুতদের সঙ্গে আফগানরা সহযোগিতা করেনি। রাজপুতদের সঙ্গে সঙ্গে আফগানরাও যদি মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করত তাহলে হয়ত ভারতের ইতিহাসের গতি অন্য পথে প্রবাহিত হতে পারত।     ঘর্ঘরার যুদ্ধ (১৫২৯ খ্রিস্টাব্দ): বাবর আফগানদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে বিহারের সীমান্তে পৌঁছান। পূর্ব ভারতে মুঘল আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য জৌনপুরের শাসনকর্তা মামুদ লোদি বিহারের আফগান নেতা শেরশাহ, এবং বাংলার সুলতান মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত ঐক্যশক্তি জোট গঠন করেন। বাবর নুসরৎশাহের কাছে দূত পাঠিয়ে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করতে বলেন। এর পর মামুদ লোদি, ও শেরশাহ মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বাবর এলাহাবাদ, বারাণসী দখল করে বিহারের আরো জেলা অধিকার করার জন্...

একজন ঐতিহাসিক হিসেবে আবুল ফজলের মূল্যায়ন করো ।

আবুল ফজল:       ভারতবর্ষে মুসলমান শক্তির উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা যেমন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন প্রবণতার সৃষ্টি করেছিল, তেমনি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও নতুন এক যুগ বহন করে এনেছিল। মোগল যুগের ইতিহাসচর্চা বিশেষ করে দরবারী ইতিহাসের শ্রেষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন আবুল ফজল। আকবরের মন্ত্রী, বন্ধু, রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিবিদ ও সামরিক অফিসার আবুল ফজল ইতিহাস রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। শৈশবেই তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে ছিলেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি জ্ঞানার্জনের সমস্ত শাখায় দক্ষতা লাভ করেন। নির্যাতিত ও অত্যাচারিত পরিবারের দুর্ভাগ্য আবুল ফজলের চিন্তার উপর গভীর ছাপ ফেলেছিল। মোগল সম্রাট আকবরের আশ্রয় ও পৃষ্টপোষকতা লাভ করার পর তিনি রচনা করেন দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ-‘আকবরনামা’ ও ‘আইন-ই-আকবরী’।         মধ্যযুগের ভারতের ঐতিহাসিকদের মধ্যে আবুল ফজল ছিলেন সবচেয়ে প্রতিভাবান। ‘আকবরনামা’-র দ্বিতীয় খন্ডে তিনি ইতিহাস ও ইতিহাস তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর মতামত রেখেছেন। পূর্বসূরীদের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীর সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি বলেছেন, ‘এদের কাছে ইতিহাস হল মুসলমানদের ভারত জয়, শাসন এবং হিন...