সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

১৫২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল-আফগান দ্বন্দ্বের বিবরণ দাও।

মুঘল-আফগান দ্বন্দ্ব: 


    ভারতে মুঘল শক্তির উত্থান ও বিকাশের সঙ্গে মুঘল আফগানি দ্বন্দ্বের সমান্তরাল অবস্থান দেখা যায়। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল আফগান দ্বন্দ্ব চলতে থাকে।

     খানুয়ার যুদ্ধ: ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে মেবারের রানা সংগ্রাম সিংহের সঙ্গে বাবরের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধে রানা সংগ্রাম সিংহ পরাজিত হন। এই যুদ্ধে রাজপুতদের সঙ্গে আফগানরা সহযোগিতা করেনি। রাজপুতদের সঙ্গে সঙ্গে আফগানরাও যদি মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করত তাহলে হয়ত ভারতের ইতিহাসের গতি অন্য পথে প্রবাহিত হতে পারত।

    ঘর্ঘরার যুদ্ধ (১৫২৯ খ্রিস্টাব্দ): বাবর আফগানদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে বিহারের সীমান্তে পৌঁছান। পূর্ব ভারতে মুঘল আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য জৌনপুরের শাসনকর্তা মামুদ লোদি বিহারের আফগান নেতা শেরশাহ, এবং বাংলার সুলতান মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত ঐক্যশক্তি জোট গঠন করেন। বাবর নুসরৎশাহের কাছে দূত পাঠিয়ে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করতে বলেন। এর পর মামুদ লোদি, ও শেরশাহ মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বাবর এলাহাবাদ, বারাণসী দখল করে বিহারের আরো জেলা অধিকার করার জন্য প্রবেশ করলে উভয় পক্ষে যুদ্ধ বাধে। আফগানরা পরাজিত হয়। নসরত শাহ বাবরের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। ফলে আফগানদের রাজনৈতিক প্রভুত্বের সম্ভাবনা সাময়িক ভাবে বিলুপ্ত হয় এবং মুঘল সাম্রাজ্য বিহার পর্যন্ত সুবিস্তৃত হয়।

     শেরশাহের সঙ্গে হুমায়ুনের বিরোধ: বিহারের আফগান জায়গিরদার শেরশাহ বিহার ও বাংলায় একাধিক অভিযান করেন এবং আফগানদের সংঘবদ্ধ করতে উদ্যোগী হন। শেরশাহ বিহারে নিজ প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দ শেরশাহ বাংলার রাজধানী গৌড় আক্রমণ করেন। শেরশাহ শক্তি বৃদ্ধিতে ভীত হয়ে ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে শেরশাহ অর্ন্তভুক্ত অঞ্চল চুনার দখল করেন। এর পর হুমায়ুন গৌড় অবরোধ করলে তাঁর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ না হয়ে গৌড় ছেড়ে চলে যান। হুমায়ুনের বাংলায় থাকাকালীন শেরশাহ বারাণসী, জৌনপুর ও কনৌজ অধিকার করেন, হুমায়ুন ভীত হয়ে আগ্রার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। বক্সারের কাছে চৌসা নামে এক স্থানে হুমায়ুন ও শেরশাহ মধ্যে যুদ্ধ হয়। হুমায়ুন পরাজিত হন এবং আগ্রায় পালিয়ে যান। এর ফলে বাংলা, বিহার, জৌনপুর শেরশাহের দখলে চলে আসে।

     কনৌজের যুদ্ধ (১৫৪০ খ্রিস্টাব্দ): ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ুন এক বিশাল সৈন্য বাহিনী নিয়ে শের খাঁর বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। কনৌজের কাছে শেরশাহ ও হুমায়ুনের মধ্যে যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে হুমায়ুন পরাজিত ও সিংহাসনচ্যুত হয়ে পালিয়ে যান। এই যুদ্ধের ফলে শের খাঁ ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে আবার আফগান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

    কাবুল ও কান্দাহার জয়লাভ: আশ্রয়ের জন্য অবশেষে হুমায়ুন সিন্ধুদেশে উপস্থিত হন। এর পর রাজা মালদেবের আমন্ত্রণে মাড়কারের দিকে অগ্রসর হন হুমায়ুন। কিন্তু মালদেব শেরশাহের সঙ্গে চুক্তি করে হুমায়ূনকে বন্দি করতে সচেষ্ট হলে তিনি আবার সিন্ধু অঞ্চলে ফিরে আসেন। হুমায়ুন কামরানের নিকট সাহায্য চাইলে কামরান তাঁকে বন্দি করতে উদ্যোগী হন এর পর তিনি পারস্যের শাহ আহম্মদের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি হুমায়ুনকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করেন। এই সৈন্য বাহিনীর সাহায্যে কাবুল ও কান্দাহার জয় করেন ১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দে এবং চুক্তির শর্ত অনুসারে কান্দাহার পারস্যের শাহ আহমদকে দান করেন।

    মুঘল সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা: অল্প দিনের মধ্যেই পারস্যের শাহর মৃত্যু হলে হুমায়ুন কান্দাহার নিজ অধিকারে আনেন। অন্যদিকে ১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দে শেরশাহের মৃত্যু হয়। ফলে আফগান শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। শেরশাহের বংশধরদের মধ্যে বিবাদের সুযোগে হুমায়ুন ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে লাহোর জয় করেন এবং সিকন্দর শুরকে পরাজিত করে দিল্লি ও আগ্রা অধিকার করেন। তিনি আবার মুঘল সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। মুঘল আফগান দ্বন্দ্বের শেষ পর্যন্ত অবসান হয় এবং মুঘলরা স্থায়ী প্রতিষ্ঠা লাভ করে।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অবশিল্পায়ন কি ? ঔপনিবেশিক ভারতে অবশিল্পায়নের কারণ ও ফলাফল লেখো ।

অবশিল্পায়নঃ        অবশিল্পায়ন বলতে বোঝায় শিল্পায়নের বিপরীত বা শিল্পের অধোগতি। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনধীন ভারতের চিরাচরিত ও ঐতিহ্যশালী হস্তশিল্প-কুটিরশিল্পের ধ্বংস সাধনই মূলত অবশিল্পায়ন। সব্যসাচী ভট্টাচার্যের মতে যদি দেশের মানুষ শিল্প-কর্ম ছেড়ে চাষ-আবাদে জীবিকা অর্জন শুরু করে অথবা জাতীয় কৃষিজ ও অংশ বাড়তে থাকে এবং শিল্পজ অংশ কমতে থাকে তাকে অব-অবশিল্পায় বলে। অবশিল্পায়নের ফলে ভারতের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের অবশিল্পায়ন সম্পর্কে প্রথম পর্বে দাদাভাই নাও রোজি, রমেশ চন্দ্র দত্ত, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনীপাম দত্ত জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনী পামদত্ত, গ্যাডগিল, বি.ডি. বসু, নরেন্দ্রকৃয় সিংহ, বিপান চন্দ্র, অমিয় বাগচি প্রমুখ ঐতিহাসিক আলোচনা করেছেন। অব-শিল্পায়নের কারণঃ (১) কাঁচামালের রপ্তানি: ভারতীয় শিল্পের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে কাঁচামাল রপ্তানি শুরু হয়। ভারত ইংল্যান্ডের কলকারখানার খোলা বাজার ও কাঁচামাল সরবরাহের উৎসে পরিণত হয়। ভারত থেকে তুলো, নীল, কফি, চা, রেশম প্রভৃতি ইং...

জোটনিরপেক্ষ নীতি কী ? জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব লেখো।

জোটনিরপেক্ষ নীতিঃ     দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে একদিকে সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী বা সমাজতান্ত্রিক জোট, অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়। এই দুই জোটের কোনোটিতেই যোগ না দিয়ে, স্বাধীনভাবে উভয় জোটের সঙ্গেই বন্ধুত্ব বা সমদূরত্ব বজায় রেখে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার নীতি জোটনিরপেক্ষ নীতি নামে পরিচিত। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের কারণ বা উদ্দেশ্য ঃ    মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী জোট ও সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী জোটের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত ‘ঠান্ডা লড়াই'-এর আর্বত থেকে নিজেকে দূরে রেখে, জাতীয় স্বার্থ ও নবলব্ধ স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য ভারত জোটনিরপেক্ষ বিদেশনীতি গ্রহণ করে। ভারতে জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের কারণগুলি হল— [1] ভৌগোলিক সুরক্ষা : এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে এমন একটা জায়গায় ভারতের অবস্থান যা তাকে মধ্যপ্রাচ্য। ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী দেশে পরিণত করেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চিন, ব্রহ্মদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশি...

চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপ সম্পর্কে আলোচনা করো।

অথবা, রাজরাজ ও প্রথম রাজেন্দ্র চোলের নেতৃত্বে নৌ সাম্রাজ্যের বিস্তারের ইতিহাস লেখো। চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপঃ       প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে চোল যুগ সামুদ্রিক কার্যকলাপের জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। রাজরাজের শাসনকাল থেকে প্রথম কুলোতুঙ্গের শাসনকাল পর্যন্ত প্রায় ১৩৫ বছর চোল রাজারা সামুদ্রিক সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। ঐতিহাসিক পানিক্করের মতে, প্রাচীন ভারতের শুধু চোল রাজারাই সামুদ্রিক শক্তির বিস্তারে উৎকর্ষ দেখিয়েছিলেন। চোল রাজাদের নৌ সাম্রাজ্য বিস্তারের পিছনে বাণিজ্যের বিস্তার, উপনিবেশ স্থাপন, আরব আক্রমণ প্রতিহত করা প্রভৃতি বিষয়গুলি মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।        রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল পিতা-পুত্র চোলদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় চোল ইতিহাস শতাব্দীকাল ব্যাপী ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। চোল রাজ্য ছিল একটি ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাজ্য, যাকে রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল ভারতের মূল ভূখন্ড ছাড়িয়ে তাদের নৌবহরের দাপটে বঙ্গোপসাগরকে এক বিরাট সামুদ্রিক সাম্রাজ্যে পরিণত করে। তাই বলা যায় তার...

একজন ঐতিহাসিক হিসেবে আবুল ফজলের মূল্যায়ন করো ।

আবুল ফজল:       ভারতবর্ষে মুসলমান শক্তির উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা যেমন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন প্রবণতার সৃষ্টি করেছিল, তেমনি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও নতুন এক যুগ বহন করে এনেছিল। মোগল যুগের ইতিহাসচর্চা বিশেষ করে দরবারী ইতিহাসের শ্রেষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন আবুল ফজল। আকবরের মন্ত্রী, বন্ধু, রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিবিদ ও সামরিক অফিসার আবুল ফজল ইতিহাস রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। শৈশবেই তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে ছিলেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি জ্ঞানার্জনের সমস্ত শাখায় দক্ষতা লাভ করেন। নির্যাতিত ও অত্যাচারিত পরিবারের দুর্ভাগ্য আবুল ফজলের চিন্তার উপর গভীর ছাপ ফেলেছিল। মোগল সম্রাট আকবরের আশ্রয় ও পৃষ্টপোষকতা লাভ করার পর তিনি রচনা করেন দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ-‘আকবরনামা’ ও ‘আইন-ই-আকবরী’।         মধ্যযুগের ভারতের ঐতিহাসিকদের মধ্যে আবুল ফজল ছিলেন সবচেয়ে প্রতিভাবান। ‘আকবরনামা’-র দ্বিতীয় খন্ডে তিনি ইতিহাস ও ইতিহাস তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর মতামত রেখেছেন। পূর্বসূরীদের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীর সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি বলেছেন, ‘এদের কাছে ইতিহাস হল মুসলমানদের ভারত জয়, শাসন এবং হিন...