সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কোরিয়া সংকট বা কোরিয়া যুদ্ধের বর্ণনা দাও।

কোরিয়া সংকট বা কোরিয়া যুদ্ধেঃ


ভূমিকা : মাও জে দঙ্-এর নেতৃত্বে চিনে প্রজাতন্ত্র গঠিত হওয়ার (১৯৪৯ খ্রি., অক্টোবর) ৯ মাস পরে কোরিয়ার যুদ্ধ শুরু হয় (১৯৫০ খ্রি., ২৫ জুন)। ১৯৪৫ সালে কোরিয়াবাসীর অনুমতি ছাড়াই কোরিয়াকে উত্তর ও দক্ষিণে ভাগ করা হয়েছিল। ৩৮° অক্ষরেখাকে দুই কোরিয়ার মধ্যে সীমারেখা হিসেবে ধার্য করা হয়। কায়রো সম্মেলনে (১৯৪৩ খ্রি.) কোরিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার ওপরে যথাক্রমে সোভিয়েত রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের আধিপত্য কায়েম করলে কোরিয়া সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক ডি. এফ. ফ্লেমিং তাঁর 'দ্য কোল্ড ওয়ার অ্যান্ড ইটস অরিজিন' গ্রন্থে লিখেছেন— মার্কিন নাগরিকদের কাছে কোরিয়ার যুদ্ধের উদ্‌বর্তপত্র অত্যন্ত নেতিবাচক ছিল।

সংকটের সূত্রপাত: কোরিয়া ১৯১০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই জাপানের কর্তৃত্বাধীন ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে মার্কিন সেনা ও সোভিয়েত লালফৌজ জাপানের হাত থেকে কোরিয়াকে মুক্ত করে। অবশেষে জাপান সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হলে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ৩৮° অক্ষরেখা বরাবর উত্তরাংশে সোভিয়েত রাশিয়ার ও দক্ষিণাংশে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন স্বাভাবিকভাবেই উভয় শক্তি নিজ নিজ এলাকায় নিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী সরকার প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার সোভিয়েত সমর্থিত সেনাবাহিনী ৩৮° অক্ষরেখা বরাবর এগিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় ঢুকলে কোরিয়া যুদ্ধের সূচনা ঘটে, যার অবসান ঘটে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুলাই।

সমস্যা সমাধানে কমিশন গঠন : ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে মস্কোয় রাশিয়া-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিলিত হয়ে এক ‘যুগ্ম কমিশন' গঠন করে। এই কমিশন কোরিয়ায় অস্থায়ী সরকার গঠন করবে বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু আদর্শগত মতানৈক্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্র তখন বিষয়টি রাষ্ট্রসংঘে উত্থাপন করলে সমস্যা সমাধানের জন্য সাধারণ সভা একটি অস্থায়ী কমিশন (United Nations Temporary Commission on Korea) গঠন করে (সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭ খ্রি.)। ওই কমিশনের ওপর কোরিয়া থেকে বিদেশি সেনা অপসারণ এবং শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব অর্পিত হয়। ভারতীয় কূটনীতিবিদ কে. পি. এস. মেনন ওই কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন।

দক্ষিণ কোরিয়ায় সরকার গঠন: সোভিয়েত রাশিয়া কমিশনের সদস্যদের উত্তর কোরিয়ায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। রাষ্ট্রসংঘ তখন নিজ তত্ত্বাবধানে দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি নির্বাচনের আয়োজন করে (১৯৪৮ খ্রি.)। এরই প্রেক্ষিতে ওই বছর ১৫ আগস্ট প্রজাতান্ত্রিক কোরিয়া (Republic of Korea) নামে সেখানে মার্কিন প্রভাবিত একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সিওল হয় এর রাজধানী। এই সরকারকেই রাষ্ট্রসংঘ সমগ্র কোরিয়ার একমাত্র বৈধ সরকার বলে স্বীকৃতি জানায় (১২ ডিসেম্বর, ১৯৪৮ খ্রি.)। পরের বছর ১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রও প্রজাতান্ত্রিক কোরিয়া তথা দক্ষিণ কোরিয়াকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দান করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র সমস্ত দিক থেকেই দক্ষিণ কোরিয়াকে সাহায্য করতে থাকে। মার্কিন মদতপুষ্ট সিংম্যান রি ছিলেন এই সরকারের প্রধান।

উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসন: দক্ষিণ কোরিয়াকে কেন্দ্র করে সুদূর প্রাচ্যে যখন একটি মার্কিন ঘাঁটি তৈরি হচ্ছে, তখন কোরিয়া সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলেন উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট নেতা কিম-উল-সুঙ। সোভিয়েত মদতে তিনি সেখানে জনগণতান্ত্রিক কোরিয়া (Peoples Democratic Republic of Korea) নামে একটি সরকার গঠন করেন। পানমুনজম হয় এর রাজধানী। এই সরকারের সেনাবাহিনী কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই হঠাৎ ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৫- জুন ৩৮° অক্ষরেখা অতিক্রম করে দক্ষিণে প্রবেশ করলে দু-পক্ষের মধ্যে শুরু হয় প্রত্যক্ষ লড়াই।

আন্তর্জাতিক সেনা প্রেরণ: নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়াকে আক্রমণকারী বলে চিহ্নিত করে এবং কোরিয়ায় রাষ্ট্রসংঘের সেনাবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। 

চিনের অংশগ্রহণ : রাষ্ট্রসংঘ প্রেরিত বাহিনীর প্রধান জে. ম্যাক আর্থার দক্ষিণ থেকে শত্রুসেনা বিতাড়িত করার পর ৩৮° অক্ষরেখা অতিক্রম করে উত্তর কোরিয়ায় প্রবেশ করেন। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। কিন্তু এখানে না থেমে ম্যাক আর্থারের নেতৃত্বে রাষ্ট্রসংঘ বাহিনী চিন সীমান্তে ইয়ালু নদীর তীর পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে সেখানে বোমাবর্ষণ করলে চিন তার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এরপরই চিন কোরিয়া যুদ্ধে যোগদান করে এবং অতি দ্রুত দক্ষি কোরিয়ার রাজধানী সিওল দখল করে নেয় (১৯৫১ খ্রি.)।

যুদ্ধের অবসান: মার্কিন রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যান পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ম্যাক আর্থারকে বরখাস্ত করেন। এরপরই সোভিয়েত রাশিয়া উভয়পক্ষের মধ্যে সমঝোতা ও যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলে যুদ্ধের গতি মন্থর হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জুলাই উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পানমুনজমে উভয়পক্ষের যুদ্ধবিরতি ঘটে। পূর্বের মতো ৩৮° অক্ষরেখা ধরেই দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রসীমা নির্ধারিত হয়।

কোরিয়া যুদ্ধের ফলাফল: কোরিয়া যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য আদৌ সফল হয়নি। এই যুদ্ধের ফলে —
  1. বিভাজন স্বীকার : বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দুই কোরিয়ার সংযুক্তি তো দূরের কথা, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিভাজনকেই মেনে নিতে হয়। 
  2. মানবিক ও আর্থিক ক্ষতি : দীর্ঘস্থায়ী ওই যুদ্ধে দুই কোরিয়ারই প্রচণ্ড ক্ষতি হয়। মার্কিনি, কোরীয়, চিনা সব মিলিয়ে ২৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। উত্তর ও দক্ষিণ উভয় অঞ্চলেরই অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। 
  3. আমেরিকার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রস্তুতি : যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধের সুযোগে চিনকে দুর্বল করতে চাইলেও তা পারেনি। তাই তখন থেকে সে তার সামরিক বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করে গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেয়। 
  4. ঠাণ্ডা লড়াইয়ের বিস্তার : এই যুদ্ধের ফলে ঠান্ডা লড়াই সমগ্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে।

কোরিয়া যুদ্ধের গুরুত্ব : আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোরিয়া যুদ্ধ একাধিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ—
  1. সামরিক জোট তৈরিতে : এই যুদ্ধের পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফিলিপিন্‌স, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান, তাইওয়ান প্রভৃতি দেশের সঙ্গে একের পর এক সামরিক জোট প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়। 
  2. রাষ্ট্রসংঘের মর্যাদা হ্রাসে : এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন স্বার্থে রাষ্ট্রসংঘকে ব্যবহার করা হলে রাষ্ট্রসংঘের মর্যাদা হ্রাস পায়। 
  3. শাস্তিপ্রতিষ্ঠায় : এই যুদ্ধের প্রেক্ষিতেই ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভা শান্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রস্তাব পাশ করেছিল। এই যুদ্ধ নিঃসন্দেহে পারমাণবিক অস্ত্রের যুগেও সীমিত যুদ্ধের ঐতিহ্য রক্ষা করেছিল। 
  4. ঠান্ডা লড়াইয়ের সম্প্রসারণে: এতদিন পর্যন্ত ঠান্ডা লড়াই ইউরোপীয় ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন এই যুদ্ধে সাম্যবাদী চিনের অংশগ্রহণের ফলে তা এশিয়া মহাদেশেও সম্প্রসারিত হয়। 
  5. সোভিয়েত-চিন মৈত্রী প্রতিষ্ঠায় : এই যুদ্ধের প্রেক্ষিতেই সোভিয়েত ইউনিয়ন- বিরোধী মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বৃহত্তর সাম্যবাদ-বিরোধী রূপ গ্রহণ করে। এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই সোভিয়েত-চিন মৈত্রী দৃঢ় হয়।

উপসংহার: কোরিয়ার যুদ্ধ প্রকৃত অর্থে ছিল অনাবশ্যক ও নিষ্ফল, কেননা দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধের ফল ছিল শূন্য। ঐতিহাসিক পার্ল এস. বার্কের মতে— কোরিয়ার যুদ্ধের জন্য এশিয়াবাসীর মন থেকে মার্কিন প্রীতি হারিয়ে যায়, যা আমরা হারাতে পারি না। 



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অবশিল্পায়ন কি ? ঔপনিবেশিক ভারতে অবশিল্পায়নের কারণ ও ফলাফল লেখো ।

অবশিল্পায়নঃ        অবশিল্পায়ন বলতে বোঝায় শিল্পায়নের বিপরীত বা শিল্পের অধোগতি। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনধীন ভারতের চিরাচরিত ও ঐতিহ্যশালী হস্তশিল্প-কুটিরশিল্পের ধ্বংস সাধনই মূলত অবশিল্পায়ন। সব্যসাচী ভট্টাচার্যের মতে যদি দেশের মানুষ শিল্প-কর্ম ছেড়ে চাষ-আবাদে জীবিকা অর্জন শুরু করে অথবা জাতীয় কৃষিজ ও অংশ বাড়তে থাকে এবং শিল্পজ অংশ কমতে থাকে তাকে অব-অবশিল্পায় বলে। অবশিল্পায়নের ফলে ভারতের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের অবশিল্পায়ন সম্পর্কে প্রথম পর্বে দাদাভাই নাও রোজি, রমেশ চন্দ্র দত্ত, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনীপাম দত্ত জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনী পামদত্ত, গ্যাডগিল, বি.ডি. বসু, নরেন্দ্রকৃয় সিংহ, বিপান চন্দ্র, অমিয় বাগচি প্রমুখ ঐতিহাসিক আলোচনা করেছেন। অব-শিল্পায়নের কারণঃ (১) কাঁচামালের রপ্তানি: ভারতীয় শিল্পের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে কাঁচামাল রপ্তানি শুরু হয়। ভারত ইংল্যান্ডের কলকারখানার খোলা বাজার ও কাঁচামাল সরবরাহের উৎসে পরিণত হয়। ভারত থেকে তুলো, নীল, কফি, চা, রেশম প্রভৃতি ইং...

জোটনিরপেক্ষ নীতি কী ? জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব লেখো।

জোটনিরপেক্ষ নীতিঃ     দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে একদিকে সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী বা সমাজতান্ত্রিক জোট, অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়। এই দুই জোটের কোনোটিতেই যোগ না দিয়ে, স্বাধীনভাবে উভয় জোটের সঙ্গেই বন্ধুত্ব বা সমদূরত্ব বজায় রেখে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার নীতি জোটনিরপেক্ষ নীতি নামে পরিচিত। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের কারণ বা উদ্দেশ্য ঃ    মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী জোট ও সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী জোটের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত ‘ঠান্ডা লড়াই'-এর আর্বত থেকে নিজেকে দূরে রেখে, জাতীয় স্বার্থ ও নবলব্ধ স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য ভারত জোটনিরপেক্ষ বিদেশনীতি গ্রহণ করে। ভারতে জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের কারণগুলি হল— [1] ভৌগোলিক সুরক্ষা : এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে এমন একটা জায়গায় ভারতের অবস্থান যা তাকে মধ্যপ্রাচ্য। ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী দেশে পরিণত করেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চিন, ব্রহ্মদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশি...

চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপ সম্পর্কে আলোচনা করো।

অথবা, রাজরাজ ও প্রথম রাজেন্দ্র চোলের নেতৃত্বে নৌ সাম্রাজ্যের বিস্তারের ইতিহাস লেখো। চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপঃ       প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে চোল যুগ সামুদ্রিক কার্যকলাপের জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। রাজরাজের শাসনকাল থেকে প্রথম কুলোতুঙ্গের শাসনকাল পর্যন্ত প্রায় ১৩৫ বছর চোল রাজারা সামুদ্রিক সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। ঐতিহাসিক পানিক্করের মতে, প্রাচীন ভারতের শুধু চোল রাজারাই সামুদ্রিক শক্তির বিস্তারে উৎকর্ষ দেখিয়েছিলেন। চোল রাজাদের নৌ সাম্রাজ্য বিস্তারের পিছনে বাণিজ্যের বিস্তার, উপনিবেশ স্থাপন, আরব আক্রমণ প্রতিহত করা প্রভৃতি বিষয়গুলি মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।        রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল পিতা-পুত্র চোলদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় চোল ইতিহাস শতাব্দীকাল ব্যাপী ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। চোল রাজ্য ছিল একটি ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাজ্য, যাকে রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল ভারতের মূল ভূখন্ড ছাড়িয়ে তাদের নৌবহরের দাপটে বঙ্গোপসাগরকে এক বিরাট সামুদ্রিক সাম্রাজ্যে পরিণত করে। তাই বলা যায় তার...

১৫২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল-আফগান দ্বন্দ্বের বিবরণ দাও।

মুঘল-আফগান দ্বন্দ্ব:      ভারতে মুঘল শক্তির উত্থান ও বিকাশের সঙ্গে মুঘল আফগানি দ্বন্দ্বের সমান্তরাল অবস্থান দেখা যায়। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল আফগান দ্বন্দ্ব চলতে থাকে।      খানুয়ার যুদ্ধ: ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে মেবারের রানা সংগ্রাম সিংহের সঙ্গে বাবরের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধে রানা সংগ্রাম সিংহ পরাজিত হন। এই যুদ্ধে রাজপুতদের সঙ্গে আফগানরা সহযোগিতা করেনি। রাজপুতদের সঙ্গে সঙ্গে আফগানরাও যদি মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করত তাহলে হয়ত ভারতের ইতিহাসের গতি অন্য পথে প্রবাহিত হতে পারত।     ঘর্ঘরার যুদ্ধ (১৫২৯ খ্রিস্টাব্দ): বাবর আফগানদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে বিহারের সীমান্তে পৌঁছান। পূর্ব ভারতে মুঘল আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য জৌনপুরের শাসনকর্তা মামুদ লোদি বিহারের আফগান নেতা শেরশাহ, এবং বাংলার সুলতান মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত ঐক্যশক্তি জোট গঠন করেন। বাবর নুসরৎশাহের কাছে দূত পাঠিয়ে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করতে বলেন। এর পর মামুদ লোদি, ও শেরশাহ মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বাবর এলাহাবাদ, বারাণসী দখল করে বিহারের আরো জেলা অধিকার করার জন্...

একজন ঐতিহাসিক হিসেবে আবুল ফজলের মূল্যায়ন করো ।

আবুল ফজল:       ভারতবর্ষে মুসলমান শক্তির উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা যেমন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন প্রবণতার সৃষ্টি করেছিল, তেমনি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও নতুন এক যুগ বহন করে এনেছিল। মোগল যুগের ইতিহাসচর্চা বিশেষ করে দরবারী ইতিহাসের শ্রেষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন আবুল ফজল। আকবরের মন্ত্রী, বন্ধু, রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিবিদ ও সামরিক অফিসার আবুল ফজল ইতিহাস রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। শৈশবেই তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে ছিলেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি জ্ঞানার্জনের সমস্ত শাখায় দক্ষতা লাভ করেন। নির্যাতিত ও অত্যাচারিত পরিবারের দুর্ভাগ্য আবুল ফজলের চিন্তার উপর গভীর ছাপ ফেলেছিল। মোগল সম্রাট আকবরের আশ্রয় ও পৃষ্টপোষকতা লাভ করার পর তিনি রচনা করেন দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ-‘আকবরনামা’ ও ‘আইন-ই-আকবরী’।         মধ্যযুগের ভারতের ঐতিহাসিকদের মধ্যে আবুল ফজল ছিলেন সবচেয়ে প্রতিভাবান। ‘আকবরনামা’-র দ্বিতীয় খন্ডে তিনি ইতিহাস ও ইতিহাস তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর মতামত রেখেছেন। পূর্বসূরীদের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীর সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি বলেছেন, ‘এদের কাছে ইতিহাস হল মুসলমানদের ভারত জয়, শাসন এবং হিন...