সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

অব-উপনিবেশীকরণ বলতে কী বোঝায়? এর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।

অব-উপনিবেশীকরণ:

[1] Decolonisation বা 'অব-উপনিবেশবাদ' কথার অর্থ হল ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান, অর্থাৎ উপনিবেশবাদের বিপরীত ধারণা হল ‘অব-উপনিবেশবাদ'। জার্মান বিশেষজ্ঞ মরিৎস জুলিয়াস বন (Moritz Julius Bonn) ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম Decolonisa- tion শব্দটি ব্যবহার করেন। এককথায়, ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তিকে অব-উপনিবেশীকরণ বা Decolonisation বলা হয়। [2] অন্যভাবে বলা যায় যে, অব-উপনিবেশবাদ হল, পূর্বে কোনোঔপনিবেশিক শক্তির উপনিবেশ ছিল এমন কোনো দেশকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রদান। [3] দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫ খ্রি.) পর থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন উপনিবেশগুলি পশ্চিমি সার্বভৌম সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অধীনতা থেকে মুক্তিলাভের উদ্দেশ্যে তীব্র সংগ্রাম শুরু করলে অধিকাংশ উপনিবেশ স্বাধীনতা লাভে সক্ষম হয়। ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনতা থেকে উপনিবেশগুলির মুক্তির ঘটনাকে সাধারণভাবে অব-উপনিবেশীকরণ' (Decolonisation) বলা হয়।


প্রাচীন ও আধুনিক যুগের ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র:

1. প্রাচীন যুগের উপনিবেশ: পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। প্রাচীনকালে মিশর, পারস্য, গ্রিস, রোম, ভারত প্রভৃতি বিভিন্ন দেশ তাদের সীমানার বাইরের কোনো না কোনো দেশে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করেছিল। সুদূর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তখন ভারতের উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল বলে জানা যায়। মধ্যযুগে আরব এবং মোঙ্গলরাও দূরদেশে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল।

2. আধুনিক যুগের উপনিবেশ: আধুনিককালে উনবিংশ শতককে উপনিবেশবাদের সুবর্ণ যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই সময় ইউরোপের ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, ইটালি, ডেনমার্ক, হল্যান্ড, পোর্তুগাল, স্কটল্যান্ড, জার্মানি প্রভৃতি দেশগুলি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানও উপনিবেশের প্রসারে এগিয়ে আসে। পশ্চিমি শক্তিগুলি প্রধানত এশিয়া আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন দেশে নিজেদের ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা করে।


অব-উপনিবেশীকরণের অর্থনৈতিক তাৎপর্য:

এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ উপনিবেশ । বিদেশি শাসন মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করে। এসব দেশে অব- উপনিবেশীকরণের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল।

1. অর্থনৈতিক দুর্বলতা : উপনিবেশের অর্থ ও সম্পদ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি হস্তগত করে নিজেদের দেশের সমৃদ্ধি বাড়িয়েছিল। এদিকে ক্রমাগত শোষণের ফলে উপনিবেশগুলি দিনে দিনে নিঃস্ব ও দুর্বল হয়ে যায়। শেষপর্যন্ত ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির ওপরই এই উপনিবেশগুলি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে অব-উপনিবেশীকরণের পরেও অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে দেশের কৃষি উৎপাদন, শিল্পায়ন প্রভৃতি ব্যাহত হয় এবং সামগ্রিক উন্নয়ন থমকে যায়। সদ্য-স্বাধীন এসব দেশে বেকারত্ব এবং কোথাও কোথাও খাদ্যাভাব তীব্র আকার ধারণ করে।

2. নয়া উপনিবেশবাদ : সদ্য-স্বাধীন দেশগুলিতে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান হলেও সেসব দেশে শীঘ্রই নয়া উপনিবেশবাদ শুরু হয় । কেন-না, সদ্য-স্বাধীন দেশগুলি অর্থনৈতিক, সামরিক প্রভৃতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অত্যন্ত দুর্বল ছিল। তাই তারা নিজেদের দেশের নিরাপত্তা, শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি প্রভৃতির প্রয়োজনে ইউরোপ বা অন্যান্য স্থানের বৃহৎ শক্তিগুলির ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়। সুযোগ বুঝে বৃহৎ শক্তিগুলি সদ্য-স্বাধীন এসব দেশে অর্থনৈতিক সহায়তা দান করে সেখানে নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করে। 

3. আঞ্চলিক সহযোগিতা : অব-উপনিবেশীকরণের পরবর্তীকালে সদ্য-স্বাধীন রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। সদ্য-স্বাধীন দেশগুলি সহযোগিতামূলক বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান ও সামগ্রিক উন্নতির চেষ্টা চালায়। এসব সংগঠন যেসব বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার উদ্যোগ নেয়, সেগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা।


অব-উপনিবেশীকরণের সামাজিক তাৎপর্য:

1. বর্ণবৈষম্যবাদের বিরোধিতা: এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন উপনিবেশে শাসক শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয়রা শাসিত কৃষ্ণাঙ্গ প্রজাদের সঙ্গে তীব্র সামাজিক ব্যবধান ও অসাম্য সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু অব-উপনিবেশীকরণের পর সদ্য-স্বাধীন রাষ্ট্রগুলির বাসিন্দারা সচেতন হয় এবং বর্ণবৈষম্যবাদের তীব্র বিরোধী হয়ে ওঠে। এই বিরোধের ফলে বিশ্বে জাতিবৈরিতা ও বর্ণবৈষম্যবাদের গতি রুদ্ধ হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিকা, রোডেশিয়া থেকে বর্ণবৈষম্যবাদ বিদায় নেয়।

2. অস্থির পরিস্থিতি: এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন উপনিবেশে মুক্তিসংগ্রাম শুরু হলেও কোনো কোনো উপনিবেশ তখনই স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত ছিল না। এই পরিস্থিতিতে তারা স্বাধীনতা লাভ করলে দেশে সঠিক সুস্থ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়। কিছু কিছু উপনিবেশ নিজেদের মধ্যে তীব্র সংঘাত শুরু করে শক্তি ক্ষয় করে। আফ্রিকাসহ এশিয়ার বেশ কিছু উপনিবেশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে বিভেদের ফলে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।

3. এলিট গোষ্ঠীর শক্তি বৃদ্ধি : ঔপনিবেশিক শক্তি বিদায় নেওয়ার পর সদ্য-স্বাধীন বিভিন্ন দেশের শাসনক্ষমতা সেদেশের শিক্ষিত ও ধনী এলিট গোষ্ঠীর হাতে চলে আসে। তারা দেশে নিজ গোষ্ঠীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র মানুষ ক্ষমতালাভে ব্যর্থ হয়। 


অব-উপনিবেশীকরণের রাজনৈতিক তাৎপর্য 

1. রাজনৈতিক দিগন্তের প্রসার: এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন উপনিবেশ স্বাধীনতা লাভ করলে বিশ্ব রাজনীতির দিগন্ত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিধি আরও প্রসারিত হয়। সদ্য- স্বাধীন দেশগুলি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে শুরু করে।

2. তৃতীয় বিশ্বের উত্থান: অব-উপনিবেশীকরণের ফলে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু উপনিবেশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে স্বাধীনতা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এসব দেশ তৃতীয় বিশ্ব নামে পরিচিত। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দেশগুলি পৃথিবী থেকে উপনিবেশবাদ ও বর্ণবৈষম্য দূর করতে সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারা উপনিবেশবাদ ও বর্ণবৈষম্য দূর করতে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাহায্য নেয়।

3. জাতিপুঞ্জের প্রসার: অব-উপনিবেশীকরণের ফলে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের যথেষ্ট সম্প্রসারণ ঘটে। ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত সদ্য- স্বাধীন এসব দেশ জাতিপুঞ্জের সদস্যপদ গ্রহণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে জাতিপুঞ্জের ১৭৯টি সদস্যের মধ্যে ১০০টি সদস্য রাষ্ট্রই ছিল ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত সদ্য-স্বাধীন রাষ্ট্র। সদস্য সংখ্যা প্রচুর বৃদ্ধির ফলে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের গুরুত্ব, পরিধি ও কার্যাবলির যথেষ্ট প্রসার ঘটে।

4. জাতিভিত্তিক নতুন বিশ্ব : অব-উপনিবেশীকরণের ফলে পুরোনো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলির অধীনতা ছিন্ন করে জাতিভিত্তিক ক্ষুদ্র বৃহৎ অসংখ্য রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। স্বাধীনতা লাভের পর এসব জাতি নিজেদের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করার সুযোগ পায়।

5. সাম্রাজ্যবাদের গতিরোধ : অব-উপনিবেশীকরণের ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে অসংখ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের উত্থান ঘটে। সদ্য-স্বাধীন এসব রাষ্ট্র ইতিপূর্বে দীর্ঘকাল ধরে সাম্রাজ্যবাদের শোষণ ও আধিপত্যের যন্ত্রণা ভোগ করেছে। ফলে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত এসব দেশ স্বাভাবিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদের বিরোধী হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা লাভের পর এসব দেশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে তাদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির সাম্রাজ্যবাদের অগ্রগতির বিজয়রথ অনেকটা বাধাপ্রাপ্ত হয়।

6. ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রসার : ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির কবল থেকে মুক্ত হলেও সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রগুলিতে বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রভাব পড়ে। এসব রাষ্ট্রে সোভিয়েত রাশিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে সমাজতন্ত্রের প্রসারে এবং আমেরিকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন পুঁজিবাদের প্রসারে সক্রিয় উদ্যোগ নেয়।

উপসংহার: ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত হওয়ার পর তৃতীয় বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অবশিল্পায়ন কি ? ঔপনিবেশিক ভারতে অবশিল্পায়নের কারণ ও ফলাফল লেখো ।

অবশিল্পায়নঃ        অবশিল্পায়ন বলতে বোঝায় শিল্পায়নের বিপরীত বা শিল্পের অধোগতি। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনধীন ভারতের চিরাচরিত ও ঐতিহ্যশালী হস্তশিল্প-কুটিরশিল্পের ধ্বংস সাধনই মূলত অবশিল্পায়ন। সব্যসাচী ভট্টাচার্যের মতে যদি দেশের মানুষ শিল্প-কর্ম ছেড়ে চাষ-আবাদে জীবিকা অর্জন শুরু করে অথবা জাতীয় কৃষিজ ও অংশ বাড়তে থাকে এবং শিল্পজ অংশ কমতে থাকে তাকে অব-অবশিল্পায় বলে। অবশিল্পায়নের ফলে ভারতের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের অবশিল্পায়ন সম্পর্কে প্রথম পর্বে দাদাভাই নাও রোজি, রমেশ চন্দ্র দত্ত, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনীপাম দত্ত জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনী পামদত্ত, গ্যাডগিল, বি.ডি. বসু, নরেন্দ্রকৃয় সিংহ, বিপান চন্দ্র, অমিয় বাগচি প্রমুখ ঐতিহাসিক আলোচনা করেছেন। অব-শিল্পায়নের কারণঃ (১) কাঁচামালের রপ্তানি: ভারতীয় শিল্পের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে কাঁচামাল রপ্তানি শুরু হয়। ভারত ইংল্যান্ডের কলকারখানার খোলা বাজার ও কাঁচামাল সরবরাহের উৎসে পরিণত হয়। ভারত থেকে তুলো, নীল, কফি, চা, রেশম প্রভৃতি ইং...

জোটনিরপেক্ষ নীতি কী ? জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব লেখো।

জোটনিরপেক্ষ নীতিঃ     দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে একদিকে সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী বা সমাজতান্ত্রিক জোট, অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়। এই দুই জোটের কোনোটিতেই যোগ না দিয়ে, স্বাধীনভাবে উভয় জোটের সঙ্গেই বন্ধুত্ব বা সমদূরত্ব বজায় রেখে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার নীতি জোটনিরপেক্ষ নীতি নামে পরিচিত। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের কারণ বা উদ্দেশ্য ঃ    মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী জোট ও সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী জোটের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত ‘ঠান্ডা লড়াই'-এর আর্বত থেকে নিজেকে দূরে রেখে, জাতীয় স্বার্থ ও নবলব্ধ স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য ভারত জোটনিরপেক্ষ বিদেশনীতি গ্রহণ করে। ভারতে জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের কারণগুলি হল— [1] ভৌগোলিক সুরক্ষা : এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে এমন একটা জায়গায় ভারতের অবস্থান যা তাকে মধ্যপ্রাচ্য। ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী দেশে পরিণত করেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চিন, ব্রহ্মদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশি...

চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপ সম্পর্কে আলোচনা করো।

অথবা, রাজরাজ ও প্রথম রাজেন্দ্র চোলের নেতৃত্বে নৌ সাম্রাজ্যের বিস্তারের ইতিহাস লেখো। চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপঃ       প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে চোল যুগ সামুদ্রিক কার্যকলাপের জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। রাজরাজের শাসনকাল থেকে প্রথম কুলোতুঙ্গের শাসনকাল পর্যন্ত প্রায় ১৩৫ বছর চোল রাজারা সামুদ্রিক সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। ঐতিহাসিক পানিক্করের মতে, প্রাচীন ভারতের শুধু চোল রাজারাই সামুদ্রিক শক্তির বিস্তারে উৎকর্ষ দেখিয়েছিলেন। চোল রাজাদের নৌ সাম্রাজ্য বিস্তারের পিছনে বাণিজ্যের বিস্তার, উপনিবেশ স্থাপন, আরব আক্রমণ প্রতিহত করা প্রভৃতি বিষয়গুলি মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।        রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল পিতা-পুত্র চোলদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় চোল ইতিহাস শতাব্দীকাল ব্যাপী ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। চোল রাজ্য ছিল একটি ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাজ্য, যাকে রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল ভারতের মূল ভূখন্ড ছাড়িয়ে তাদের নৌবহরের দাপটে বঙ্গোপসাগরকে এক বিরাট সামুদ্রিক সাম্রাজ্যে পরিণত করে। তাই বলা যায় তার...

১৫২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল-আফগান দ্বন্দ্বের বিবরণ দাও।

মুঘল-আফগান দ্বন্দ্ব:      ভারতে মুঘল শক্তির উত্থান ও বিকাশের সঙ্গে মুঘল আফগানি দ্বন্দ্বের সমান্তরাল অবস্থান দেখা যায়। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল আফগান দ্বন্দ্ব চলতে থাকে।      খানুয়ার যুদ্ধ: ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে মেবারের রানা সংগ্রাম সিংহের সঙ্গে বাবরের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধে রানা সংগ্রাম সিংহ পরাজিত হন। এই যুদ্ধে রাজপুতদের সঙ্গে আফগানরা সহযোগিতা করেনি। রাজপুতদের সঙ্গে সঙ্গে আফগানরাও যদি মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করত তাহলে হয়ত ভারতের ইতিহাসের গতি অন্য পথে প্রবাহিত হতে পারত।     ঘর্ঘরার যুদ্ধ (১৫২৯ খ্রিস্টাব্দ): বাবর আফগানদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে বিহারের সীমান্তে পৌঁছান। পূর্ব ভারতে মুঘল আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য জৌনপুরের শাসনকর্তা মামুদ লোদি বিহারের আফগান নেতা শেরশাহ, এবং বাংলার সুলতান মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত ঐক্যশক্তি জোট গঠন করেন। বাবর নুসরৎশাহের কাছে দূত পাঠিয়ে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করতে বলেন। এর পর মামুদ লোদি, ও শেরশাহ মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বাবর এলাহাবাদ, বারাণসী দখল করে বিহারের আরো জেলা অধিকার করার জন্...

একজন ঐতিহাসিক হিসেবে আবুল ফজলের মূল্যায়ন করো ।

আবুল ফজল:       ভারতবর্ষে মুসলমান শক্তির উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা যেমন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন প্রবণতার সৃষ্টি করেছিল, তেমনি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও নতুন এক যুগ বহন করে এনেছিল। মোগল যুগের ইতিহাসচর্চা বিশেষ করে দরবারী ইতিহাসের শ্রেষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন আবুল ফজল। আকবরের মন্ত্রী, বন্ধু, রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিবিদ ও সামরিক অফিসার আবুল ফজল ইতিহাস রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। শৈশবেই তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে ছিলেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি জ্ঞানার্জনের সমস্ত শাখায় দক্ষতা লাভ করেন। নির্যাতিত ও অত্যাচারিত পরিবারের দুর্ভাগ্য আবুল ফজলের চিন্তার উপর গভীর ছাপ ফেলেছিল। মোগল সম্রাট আকবরের আশ্রয় ও পৃষ্টপোষকতা লাভ করার পর তিনি রচনা করেন দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ-‘আকবরনামা’ ও ‘আইন-ই-আকবরী’।         মধ্যযুগের ভারতের ঐতিহাসিকদের মধ্যে আবুল ফজল ছিলেন সবচেয়ে প্রতিভাবান। ‘আকবরনামা’-র দ্বিতীয় খন্ডে তিনি ইতিহাস ও ইতিহাস তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর মতামত রেখেছেন। পূর্বসূরীদের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীর সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি বলেছেন, ‘এদের কাছে ইতিহাস হল মুসলমানদের ভারত জয়, শাসন এবং হিন...