সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

বাংলায় নবজাগরণের প্রকৃতি আলোচনা করো। এর সীমাবদ্ধতা কী ছিল?

বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি বা চরিত্র:

সূচনা: ‘রেনেসাঁ’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ হল জাগৃতি বা নবজাগরণ। উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনকে ইতিহাসবিদরা 'নবজাগরণ' আখ্যা দিয়েছেন।

[1] অর্থ: পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত তৎকালীন বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজ অনুসন্ধানী মন ও যুক্তিতর্কের দ্বারা সবকিছুর মূল্যায়ন শুরু করে। এই সময় চিরাচরিত শাস্ত্রের নতুন ব্যাখ্যা, নীতিশাস্ত্রের ও ধর্মশাস্ত্রের নতুন মূল্যায়ন শুরু হয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, সমাজ, সমস্ত ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় জাগরণ শুরু হয়, যা এক কথায় নবজাগরণ নামে পরিচিত।

[2] ভিত্তি : নবজাগরণ বলতে শুধু প্রাচীন দেশীয় ও ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নতুন মূল্যায়ন প্রচেষ্টাকে বোঝায় না। এই সময় ইংরেজি শিক্ষার ও ইউরোপীয় সংস্কৃতির ছোঁয়ায় বাঙালি আত্মসচেতন হয়ে ওঠে। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি পাশ্চাত্যের সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি প্রভৃতি বিষয়ে সম্যক ধারণা লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। বাঙালি নিজের ধর্মীয় এবং সামাজিক ত্রুটিবিচ্যুতিগুলি এবং সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনের চরিত্র সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠে। এই সচেতনতাই হল নবজাগরণের আসল ভিত্তি। নবজাগরণের মতাদর্শগত ভিত্তি কখনই ধর্মনিরপেক্ষ বা অসাম্প্রদায়িক ছিল একথা বলা যায় না। তাই অধ্যাপক সুমিত সরকার লিখেছেন—“মুসলিম স্বৈরাচারী শাসনের সহাবস্থান সংক্রান্ত ধারণা থেকেই বুদ্ধিজীবীরা একটি বিদেশি শাসন গ্রহণ করার সুবিধাজনক যৌক্তিকতা খুঁজে পেয়েছিলেন।”

[3] তিনটি ভাবধারা: বাংলার নবজাগরণের চরিত্র বিচারে কয়েকটি ভাবধারার পরিচয় পাওয়া যায়। এগুলি হল উদারপন্থী ভাবধারা, প্রাচ্যের পুনরুজ্জীবনবাদী বা ঐতিহ্যবাদী ভাবধারা এবং সমন্বয়বাদী ভাবধারা। পাশ্চাত্যের উদারপন্থী ভাবধারার প্রভাবে সমাজসংস্কার, ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, নারীমুক্তি আন্দোলন প্রভৃতি শুরু হয়। যুক্তির আলোকে প্রচলিত প্রথা এবং আচারবিধিগুলি যাচাই করে নেওয়ার রীতি চালু হয়। দ্বিতীয় ধারা অর্থাৎ প্রাচ্যের পুনরুজ্জীবনবাদ বা ঐতিহ্যবাদী ভাবধারা অনুযায়ী প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ লক্ষ করা যায়। তৃতীয় অর্থাৎ সম্বন্বয়বাদী ভাবধারা অনুযায়ী প্রাচীন যুগের যা কিছু শ্রেষ্ঠ তার সঙ্গে পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞানের যা কিছু শ্রেষ্ঠ উভয়ের সমন্বয়ের উদ্যোগ শুরু হয়।

[4] এলিটিস্ট আন্দোলন: সমালোচকদের ধারণায় উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণ ছিল এলিটিস্ট (Elitist) আন্দোলন। সমাজের মুষ্টিমেয় উচ্চবিত্ত ও উচ্চশিক্ষিত লোকেদের মধ্যেই এই নবজাগরণ সীমাবদ্ধ ছিল। উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণের প্রভাব সমাজের সকল শ্রেণির ওপর পড়েনি। তা ছাড়া এই নবজাগরণ মুসলিম সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়। কারণ মুসলিম সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে সেই সময় কোনো সংস্কার প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। তা ছাড়া হিন্দু সমাজকেন্দ্রিক সংস্কার প্রচেষ্টা গৃহীত হলেও দেখা যায় যে, হিন্দুসমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ বা কৃষক সমাজের উন্নতির জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জওহরলাল নেহরু স্পষ্টভাবে বলেছেন – ঔপনিবেশিক শাসনের জ্ঞানদীপ্তি শুধুমাত্র উচ্চবর্ণের বাঙালি হিন্দুদের ওপরই প্রতিফলিত হয়েছিল।

[5] মৌলিকত্বের অভাব : বাংলায় নবজাগরণের মৌলিকত্বের অভাব ছিল। একদিকে বেদ উপনিষদের প্রভাব, অপরদিকে পাশ্চাত্য উদারপন্থা ও হিতবাদের অনুপ্রেরণা। মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালির মতাদর্শ এক মিশ্র চিন্তাধারার জন্ম দেয়। এর কুপ্রভাব হিসেবে তারা ইংরেজি গানের সুরের ঢঙে হিন্দুস্থানি গানের চর্চা করতেন এবং ইংরেজ কায়দায় খানাপিনা করতেন ও বিলাস বৈভবে জাবন কাটাতেন। এদের অনেকেই দেশের ঐতিহ্যমণ্ডিত শিল্পের প্রতি শ্রদ্ধা না দেখালেও ইংল্যান্ড থেকে আমদানি করা বিলাসপণ্য ঘরে সাজিয়ে রেখে গর্ব অনুভব করতেন। তাই এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক অমলেশ ত্রিপাঠী বলেছেন—“প্রাচীন ইটালির দ্বিমুখবিশিষ্ট দেবতা জ্যানাসের মতো তারা একবার সামনের দিকে আধুনিক পাশ্চাত্যের প্রতি তাকিয়েছিল‌। আর একবার পেছনদিকে প্রাচীন ভারতের প্রতি তাকিয়েছিল। ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো তারা একবার পাশ্চাত্যকরণের দিকে এক একবার ঐতিহ্যগত আদর্শের দিকে এবং এই দুই-এর মধ্যবর্তী স্তরে বিচরণ করেছিল।”

[6] শহরকেন্দ্রিক: উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণ ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক। এই নবজাগরণের প্রাণকেন্দ্র ছিল কলকাতা। কলকাতার বাইরে অন্যান্য জায়গায় এই নবজাগরণ ছড়িয়ে পড়েনি। তাই গ্রামবাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এই নবজাগরণের ছোঁয়া পায়নি। বলা যায়, গ্রামের কৃষক দরিদ্র শ্রেণির সঙ্গে এই নবজাগরণের কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।


সীমাবদ্ধতা

[1] অধ্যাপক সুশোভন সরকার তার ‘নোটস অন বেঙ্গল রেনেসাঁ’ (Notes on Bengal Renaissance) শীর্ষক গ্রন্থে নবজাগরণের নানা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরলেও বাংলার এই সাংস্কৃতিক জাগরণকে নবজাগরণ অ্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, বাংলাতেই প্রথম ব্রিটিশ শাসন, বুর্জোয়া অর্থনীতি এবং আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব অনুভূত হয়। [2] ড. অমলেশ ত্রিপাঠী মনে করেন, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের বাণিজ্য বিপ্লব, নগর বিপ্লব যেভাবে ইটালির নবজাগরণের পটভূমি প্রস্তুত করেছিল, বাংলার নবজাগরণের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় নি। ইটালির নবজাগরণের কেন্দ্র ফ্লোরেন্স ছিল স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশ। অপরদিকে, বাংলার নবজাগরণের কেন্দ্র ছিল কলকাতা। বিদেশি ব্রিটিশ শাসকের অধীনস্থ, তাছাড়া কলকাতা নবজাগরণের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন কিছু জমিদার, কোম্পানির বেনিয়ান, দেশীয় গোমস্তা ও কিছু চাকুরিজীবী। অপরদিকে, ফ্লোরেন্সে নবজাগরণের পৃষ্ঠপোষকতা করেন গোরেঞ্জো মেদিচির মতো ধনী ব্যাংক ব্যবসায়ীগণ। [3] অধ্যাপক সুমিত সরকার, বাংলার নবজাগরণকে ইংরেজ নকলনবিশি বলে সমালোচনা করেছেন। বিনয় ঘোষের ধারণায় বাংলায় নবজাগরণ একটি অতিকথা মাত্র। তিনি এই নবজাগরণকে ঐতিহাসিক প্রতারণা (Historical hoax) বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন যে, বাংলায় নবজাগরণ হয়নি, যা লেখা হয়েছে এখনও লেখা, তা অতিকথন মাত্র। [4] অশোক মিত্র বাংলার উনিশ শতকের জাগরণকে “তথাকথিত নবজাগরণ” (So called Renaissance) বলে উল্লেখ করেছেন। [6] বিনয় ঘোষ তিনি এই নবজাগরণকে ‘ঐতিহাসিক প্রতারণা' আখ্যা দিয়ে বলেন “নবজাগরণ হয়নি, যা লেখা হয়েছে এখনও লেখা হয়, তা অতিকথা মাত্র।”




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অবশিল্পায়ন কি ? ঔপনিবেশিক ভারতে অবশিল্পায়নের কারণ ও ফলাফল লেখো ।

অবশিল্পায়নঃ        অবশিল্পায়ন বলতে বোঝায় শিল্পায়নের বিপরীত বা শিল্পের অধোগতি। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনধীন ভারতের চিরাচরিত ও ঐতিহ্যশালী হস্তশিল্প-কুটিরশিল্পের ধ্বংস সাধনই মূলত অবশিল্পায়ন। সব্যসাচী ভট্টাচার্যের মতে যদি দেশের মানুষ শিল্প-কর্ম ছেড়ে চাষ-আবাদে জীবিকা অর্জন শুরু করে অথবা জাতীয় কৃষিজ ও অংশ বাড়তে থাকে এবং শিল্পজ অংশ কমতে থাকে তাকে অব-অবশিল্পায় বলে। অবশিল্পায়নের ফলে ভারতের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের অবশিল্পায়ন সম্পর্কে প্রথম পর্বে দাদাভাই নাও রোজি, রমেশ চন্দ্র দত্ত, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনীপাম দত্ত জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনী পামদত্ত, গ্যাডগিল, বি.ডি. বসু, নরেন্দ্রকৃয় সিংহ, বিপান চন্দ্র, অমিয় বাগচি প্রমুখ ঐতিহাসিক আলোচনা করেছেন। অব-শিল্পায়নের কারণঃ (১) কাঁচামালের রপ্তানি: ভারতীয় শিল্পের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে কাঁচামাল রপ্তানি শুরু হয়। ভারত ইংল্যান্ডের কলকারখানার খোলা বাজার ও কাঁচামাল সরবরাহের উৎসে পরিণত হয়। ভারত থেকে তুলো, নীল, কফি, চা, রেশম প্রভৃতি ইং...

জোটনিরপেক্ষ নীতি কী ? জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব লেখো।

জোটনিরপেক্ষ নীতিঃ     দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে একদিকে সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী বা সমাজতান্ত্রিক জোট, অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়। এই দুই জোটের কোনোটিতেই যোগ না দিয়ে, স্বাধীনভাবে উভয় জোটের সঙ্গেই বন্ধুত্ব বা সমদূরত্ব বজায় রেখে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার নীতি জোটনিরপেক্ষ নীতি নামে পরিচিত। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের কারণ বা উদ্দেশ্য ঃ    মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী জোট ও সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী জোটের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত ‘ঠান্ডা লড়াই'-এর আর্বত থেকে নিজেকে দূরে রেখে, জাতীয় স্বার্থ ও নবলব্ধ স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য ভারত জোটনিরপেক্ষ বিদেশনীতি গ্রহণ করে। ভারতে জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের কারণগুলি হল— [1] ভৌগোলিক সুরক্ষা : এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে এমন একটা জায়গায় ভারতের অবস্থান যা তাকে মধ্যপ্রাচ্য। ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী দেশে পরিণত করেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চিন, ব্রহ্মদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশি...

চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপ সম্পর্কে আলোচনা করো।

অথবা, রাজরাজ ও প্রথম রাজেন্দ্র চোলের নেতৃত্বে নৌ সাম্রাজ্যের বিস্তারের ইতিহাস লেখো। চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপঃ       প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে চোল যুগ সামুদ্রিক কার্যকলাপের জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। রাজরাজের শাসনকাল থেকে প্রথম কুলোতুঙ্গের শাসনকাল পর্যন্ত প্রায় ১৩৫ বছর চোল রাজারা সামুদ্রিক সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। ঐতিহাসিক পানিক্করের মতে, প্রাচীন ভারতের শুধু চোল রাজারাই সামুদ্রিক শক্তির বিস্তারে উৎকর্ষ দেখিয়েছিলেন। চোল রাজাদের নৌ সাম্রাজ্য বিস্তারের পিছনে বাণিজ্যের বিস্তার, উপনিবেশ স্থাপন, আরব আক্রমণ প্রতিহত করা প্রভৃতি বিষয়গুলি মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।        রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল পিতা-পুত্র চোলদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় চোল ইতিহাস শতাব্দীকাল ব্যাপী ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। চোল রাজ্য ছিল একটি ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাজ্য, যাকে রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল ভারতের মূল ভূখন্ড ছাড়িয়ে তাদের নৌবহরের দাপটে বঙ্গোপসাগরকে এক বিরাট সামুদ্রিক সাম্রাজ্যে পরিণত করে। তাই বলা যায় তার...

১৫২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল-আফগান দ্বন্দ্বের বিবরণ দাও।

মুঘল-আফগান দ্বন্দ্ব:      ভারতে মুঘল শক্তির উত্থান ও বিকাশের সঙ্গে মুঘল আফগানি দ্বন্দ্বের সমান্তরাল অবস্থান দেখা যায়। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল আফগান দ্বন্দ্ব চলতে থাকে।      খানুয়ার যুদ্ধ: ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে মেবারের রানা সংগ্রাম সিংহের সঙ্গে বাবরের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধে রানা সংগ্রাম সিংহ পরাজিত হন। এই যুদ্ধে রাজপুতদের সঙ্গে আফগানরা সহযোগিতা করেনি। রাজপুতদের সঙ্গে সঙ্গে আফগানরাও যদি মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করত তাহলে হয়ত ভারতের ইতিহাসের গতি অন্য পথে প্রবাহিত হতে পারত।     ঘর্ঘরার যুদ্ধ (১৫২৯ খ্রিস্টাব্দ): বাবর আফগানদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে বিহারের সীমান্তে পৌঁছান। পূর্ব ভারতে মুঘল আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য জৌনপুরের শাসনকর্তা মামুদ লোদি বিহারের আফগান নেতা শেরশাহ, এবং বাংলার সুলতান মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত ঐক্যশক্তি জোট গঠন করেন। বাবর নুসরৎশাহের কাছে দূত পাঠিয়ে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করতে বলেন। এর পর মামুদ লোদি, ও শেরশাহ মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বাবর এলাহাবাদ, বারাণসী দখল করে বিহারের আরো জেলা অধিকার করার জন্...

একজন ঐতিহাসিক হিসেবে আবুল ফজলের মূল্যায়ন করো ।

আবুল ফজল:       ভারতবর্ষে মুসলমান শক্তির উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা যেমন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন প্রবণতার সৃষ্টি করেছিল, তেমনি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও নতুন এক যুগ বহন করে এনেছিল। মোগল যুগের ইতিহাসচর্চা বিশেষ করে দরবারী ইতিহাসের শ্রেষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন আবুল ফজল। আকবরের মন্ত্রী, বন্ধু, রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিবিদ ও সামরিক অফিসার আবুল ফজল ইতিহাস রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। শৈশবেই তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে ছিলেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি জ্ঞানার্জনের সমস্ত শাখায় দক্ষতা লাভ করেন। নির্যাতিত ও অত্যাচারিত পরিবারের দুর্ভাগ্য আবুল ফজলের চিন্তার উপর গভীর ছাপ ফেলেছিল। মোগল সম্রাট আকবরের আশ্রয় ও পৃষ্টপোষকতা লাভ করার পর তিনি রচনা করেন দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ-‘আকবরনামা’ ও ‘আইন-ই-আকবরী’।         মধ্যযুগের ভারতের ঐতিহাসিকদের মধ্যে আবুল ফজল ছিলেন সবচেয়ে প্রতিভাবান। ‘আকবরনামা’-র দ্বিতীয় খন্ডে তিনি ইতিহাস ও ইতিহাস তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর মতামত রেখেছেন। পূর্বসূরীদের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীর সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি বলেছেন, ‘এদের কাছে ইতিহাস হল মুসলমানদের ভারত জয়, শাসন এবং হিন...