সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গুপ্ত যুগের ভূমিদান ব্যবস্থা: সংক্ষিপ্ত টীকা।

গুপ্ত যুগের ভূমিদান ব্যবস্থা:

প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে গুপ্ত যুগ তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই যুগের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম একটি প্রধান দিক ছিল ভূমিদান ব্যবস্থা। সেসময় জমির চূড়ান্ত মালিকানা রাজার হাতে থাকলেও, এই ভূমিদান প্রথার হাত ধরেই সেযুগে জমি ক্রয়-বিক্রয়, কৃষিব্যবস্থার উন্নতি এবং পরিশেষে সামন্ততন্ত্রের মতো এক নতুন সমাজব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে।

গুপ্ত যুগে জমি কেনাবেচা করতে হলে রাজার আগাম অনুমতির প্রয়োজন হতো। রাজা তাঁর নিজের জমিতে কর আরোপ করতে পারতেন। তবে পুণ্যলাভের আশায় গুপ্ত রাজারা বিভিন্ন সময়ে ব্রাহ্মণ, কর্মচারী, বণিক, মন্দির বা ধর্মস্থানগুলিকে প্রচুর নিষ্কর বা করমুক্ত জমি দান করতেন। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে করমুক্ত জমি দানের এই বিশেষ ব্যবস্থাকেই বলা হয় 'অগ্রহার প্রথা'।

এই ভূমিদান ব্যবস্থার দলিলে বিভিন্ন শর্ত বা নীতিধর্ম, যেমন— 'অক্ষয় নীতিধর্ম'-এর উল্লেখ থাকত। মৌর্য যুগে জমি সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট বছরের জন্য দান করা হতো। কিন্তু গুপ্ত যুগে এই প্রথার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে এবং চিরস্থায়ী ভিত্তিতে জমি দান করার চল শুরু হয়। অগ্রহার ব্যবস্থা অনুযায়ী, যিনি জমিটি দান হিসেবে পেতেন, তিনি ও তাঁর বংশধরেরা বংশানুক্রমিকভাবে সেই জমি ভোগদখল করার অধিকার লাভ করতেন। গুপ্ত রাজারা কেবল জমি দান করেই থেমে থাকতেন না; দান করা গ্রাম বা জমির রাজস্ব আদায়, বিচারকাজ পরিচালনা এবং শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অধিকারও গ্রহীতা অর্থাৎ ব্রাহ্মণ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিতেন।

এই অগ্রহার ব্যবস্থা তৎকালীন সমাজ, রাজনীতি ও কৃষিব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। পূর্বে যেখানে জমির নিরঙ্কুশ মালিক ছিলেন রাজা, নতুন এই প্রথার ফলে সেখানে ব্যক্তিমালিকানার প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং জন্ম হয় এক নতুন ভূস্বামী বা জমিদার শ্রেণির। গ্রহীতারা নিজেদের এলাকায় স্বাধীনভাবে বিচার ও রাজস্ব আদায়ের কাজ শুরু করায় রাজার একচ্ছত্র ক্ষমতা অনেকটাই হ্রাস পায়। গুপ্ত রাজারা নিঃশর্তে দান করা এই জমিগুলোতে কোনোপ্রকার হস্তক্ষেপ করতেন না, যার ফলে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটে। পাশাপাশি, নতুন জমি-প্রাপক শ্রেণি জমির ফলন বাড়াতে উদ্যোগী হন। বহু অনাবাদি ও পতিত জমিকে কৃষিজমিতে পরিণত করা হয়, যার ফলে কৃষিব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি ঘটে।

ভূমিদান ব্যবস্থার এই সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রামশরণ শর্মা মনে করেন যে, অগ্রহার বা এই ভূমিদান ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই গুপ্ত যুগে ভারতে সামন্ততন্ত্রের বিকাশ ঘটেছিল।

ঐতিহাসিক শর্মার মতে, রাজাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ জমি ও ক্ষমতা লাভ করে গ্রামাঞ্চলে এক নতুন সামন্ত বা অভিজাত শ্রেণির সৃষ্টি হয়। এই ভূস্বামীরা গ্রামের সমস্ত ক্ষমতা নিজেদের কুক্ষিগত করে এবং সাধারণ কৃষকদের নানাভাবে শোষণ করতে শুরু করে। এর ফলে তৎকালীন সমাজে এক অদ্ভুত মেরুকরণ দেখা যায়। একদিকে ধনী সামন্ত সম্প্রদায়ের প্রতাপ যেমন বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে তেমনই দরিদ্র কৃষক সমাজের ওপর শোষণের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়।

সংক্ষেপে বলা যায়, গুপ্ত যুগের ভূমিদান ব্যবস্থা কেবল একটি সাধারণ অর্থনৈতিক লেনদেন ছিল না; এটি ছিল এমন একটি অনুঘটক, যা প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে চিরতরে বদলে দিয়ে সামন্ততান্ত্রিক যুগের সূচনা করেছিল।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অবশিল্পায়ন কি ? ঔপনিবেশিক ভারতে অবশিল্পায়নের কারণ ও ফলাফল লেখো ।

অবশিল্পায়নঃ        অবশিল্পায়ন বলতে বোঝায় শিল্পায়নের বিপরীত বা শিল্পের অধোগতি। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনধীন ভারতের চিরাচরিত ও ঐতিহ্যশালী হস্তশিল্প-কুটিরশিল্পের ধ্বংস সাধনই মূলত অবশিল্পায়ন। সব্যসাচী ভট্টাচার্যের মতে যদি দেশের মানুষ শিল্প-কর্ম ছেড়ে চাষ-আবাদে জীবিকা অর্জন শুরু করে অথবা জাতীয় কৃষিজ ও অংশ বাড়তে থাকে এবং শিল্পজ অংশ কমতে থাকে তাকে অব-অবশিল্পায় বলে। অবশিল্পায়নের ফলে ভারতের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের অবশিল্পায়ন সম্পর্কে প্রথম পর্বে দাদাভাই নাও রোজি, রমেশ চন্দ্র দত্ত, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনীপাম দত্ত জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনী পামদত্ত, গ্যাডগিল, বি.ডি. বসু, নরেন্দ্রকৃয় সিংহ, বিপান চন্দ্র, অমিয় বাগচি প্রমুখ ঐতিহাসিক আলোচনা করেছেন। অব-শিল্পায়নের কারণঃ (১) কাঁচামালের রপ্তানি: ভারতীয় শিল্পের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে কাঁচামাল রপ্তানি শুরু হয়। ভারত ইংল্যান্ডের কলকারখানার খোলা বাজার ও কাঁচামাল সরবরাহের উৎসে পরিণত হয়। ভারত থেকে তুলো, নীল, কফি, চা, রেশম প্রভৃতি ইং...

জোটনিরপেক্ষ নীতি কী ? জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব লেখো।

জোটনিরপেক্ষ নীতিঃ     দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে একদিকে সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী বা সমাজতান্ত্রিক জোট, অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়। এই দুই জোটের কোনোটিতেই যোগ না দিয়ে, স্বাধীনভাবে উভয় জোটের সঙ্গেই বন্ধুত্ব বা সমদূরত্ব বজায় রেখে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার নীতি জোটনিরপেক্ষ নীতি নামে পরিচিত। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের কারণ বা উদ্দেশ্য ঃ    মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী জোট ও সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী জোটের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত ‘ঠান্ডা লড়াই'-এর আর্বত থেকে নিজেকে দূরে রেখে, জাতীয় স্বার্থ ও নবলব্ধ স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য ভারত জোটনিরপেক্ষ বিদেশনীতি গ্রহণ করে। ভারতে জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের কারণগুলি হল— [1] ভৌগোলিক সুরক্ষা : এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে এমন একটা জায়গায় ভারতের অবস্থান যা তাকে মধ্যপ্রাচ্য। ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী দেশে পরিণত করেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চিন, ব্রহ্মদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশি...

চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপ সম্পর্কে আলোচনা করো।

অথবা, রাজরাজ ও প্রথম রাজেন্দ্র চোলের নেতৃত্বে নৌ সাম্রাজ্যের বিস্তারের ইতিহাস লেখো। চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপঃ       প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে চোল যুগ সামুদ্রিক কার্যকলাপের জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। রাজরাজের শাসনকাল থেকে প্রথম কুলোতুঙ্গের শাসনকাল পর্যন্ত প্রায় ১৩৫ বছর চোল রাজারা সামুদ্রিক সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। ঐতিহাসিক পানিক্করের মতে, প্রাচীন ভারতের শুধু চোল রাজারাই সামুদ্রিক শক্তির বিস্তারে উৎকর্ষ দেখিয়েছিলেন। চোল রাজাদের নৌ সাম্রাজ্য বিস্তারের পিছনে বাণিজ্যের বিস্তার, উপনিবেশ স্থাপন, আরব আক্রমণ প্রতিহত করা প্রভৃতি বিষয়গুলি মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।        রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল পিতা-পুত্র চোলদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় চোল ইতিহাস শতাব্দীকাল ব্যাপী ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। চোল রাজ্য ছিল একটি ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাজ্য, যাকে রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল ভারতের মূল ভূখন্ড ছাড়িয়ে তাদের নৌবহরের দাপটে বঙ্গোপসাগরকে এক বিরাট সামুদ্রিক সাম্রাজ্যে পরিণত করে। তাই বলা যায় তার...

১৫২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল-আফগান দ্বন্দ্বের বিবরণ দাও।

মুঘল-আফগান দ্বন্দ্ব:      ভারতে মুঘল শক্তির উত্থান ও বিকাশের সঙ্গে মুঘল আফগানি দ্বন্দ্বের সমান্তরাল অবস্থান দেখা যায়। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল আফগান দ্বন্দ্ব চলতে থাকে।      খানুয়ার যুদ্ধ: ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে মেবারের রানা সংগ্রাম সিংহের সঙ্গে বাবরের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধে রানা সংগ্রাম সিংহ পরাজিত হন। এই যুদ্ধে রাজপুতদের সঙ্গে আফগানরা সহযোগিতা করেনি। রাজপুতদের সঙ্গে সঙ্গে আফগানরাও যদি মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করত তাহলে হয়ত ভারতের ইতিহাসের গতি অন্য পথে প্রবাহিত হতে পারত।     ঘর্ঘরার যুদ্ধ (১৫২৯ খ্রিস্টাব্দ): বাবর আফগানদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে বিহারের সীমান্তে পৌঁছান। পূর্ব ভারতে মুঘল আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য জৌনপুরের শাসনকর্তা মামুদ লোদি বিহারের আফগান নেতা শেরশাহ, এবং বাংলার সুলতান মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত ঐক্যশক্তি জোট গঠন করেন। বাবর নুসরৎশাহের কাছে দূত পাঠিয়ে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করতে বলেন। এর পর মামুদ লোদি, ও শেরশাহ মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বাবর এলাহাবাদ, বারাণসী দখল করে বিহারের আরো জেলা অধিকার করার জন্...

একজন ঐতিহাসিক হিসেবে আবুল ফজলের মূল্যায়ন করো ।

আবুল ফজল:       ভারতবর্ষে মুসলমান শক্তির উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা যেমন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন প্রবণতার সৃষ্টি করেছিল, তেমনি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও নতুন এক যুগ বহন করে এনেছিল। মোগল যুগের ইতিহাসচর্চা বিশেষ করে দরবারী ইতিহাসের শ্রেষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন আবুল ফজল। আকবরের মন্ত্রী, বন্ধু, রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিবিদ ও সামরিক অফিসার আবুল ফজল ইতিহাস রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। শৈশবেই তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে ছিলেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি জ্ঞানার্জনের সমস্ত শাখায় দক্ষতা লাভ করেন। নির্যাতিত ও অত্যাচারিত পরিবারের দুর্ভাগ্য আবুল ফজলের চিন্তার উপর গভীর ছাপ ফেলেছিল। মোগল সম্রাট আকবরের আশ্রয় ও পৃষ্টপোষকতা লাভ করার পর তিনি রচনা করেন দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ-‘আকবরনামা’ ও ‘আইন-ই-আকবরী’।         মধ্যযুগের ভারতের ঐতিহাসিকদের মধ্যে আবুল ফজল ছিলেন সবচেয়ে প্রতিভাবান। ‘আকবরনামা’-র দ্বিতীয় খন্ডে তিনি ইতিহাস ও ইতিহাস তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর মতামত রেখেছেন। পূর্বসূরীদের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীর সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি বলেছেন, ‘এদের কাছে ইতিহাস হল মুসলমানদের ভারত জয়, শাসন এবং হিন...