সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা কী? ভারত বিভাগ ও ভারতীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়া ।

মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা: 

ভূমিকা : স্বাধীনতা লাভের জন্য ভারতবাসীর তীব্র আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম ব্রিটিশকে বাধ্য করে স্বাধীনতাদান প্রশ্নের মীমাংসা করতে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অবসান ঘটাতে ব্রিটিশ সরকার দেশভাগ অনিবার্য বলে মেনে নেয়। জিন্নার পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবির প্রতি আকাঙ্ক্ষা এবং তাতে জওহরলাল ও প্যাটেলের সম্মতি থাকায় মাউন্টব্যাটেনের উপদেষ্টা লর্ড ইসম ভারতভাগের পরিকল্পনা পাঠান ব্রিটিশ পার্লামেন্টে (১৯৪৭ খ্রি., ২ মে)। পার্লামেন্টে প্রস্তাবটি ‘ভারতীয় স্বাধীনতা আইন’ রূপে পাস হয় (যদিও রাজকীয় সম্মতি লাভ করে ১৯৪৭ খ্রি., ১৮ জুলাই), যা ‘মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা’ হিসেবে পরিচিত। মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনার চূড়ান্ত পরিণাম দেশভাগ। এ প্রসঙ্গে ড. বিপান চন্দ্র বলেছেন—আমরা এটা ভুলে গিয়েছিলাম যে, ১৯৪৭-এ নেহরু, প্যাটেল ও গান্ধিজি শুধু যা অবশ্যম্ভাবী তাকেই মেনে নিয়েছিলেন। 


পটভূমি  

[1] মাউন্টব্যাটেনের আগমন : ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজ দ্রুত সম্পাদনের জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্ট লর্ড ওয়াভেলের জায়গায় লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে ভাইসরয় নিয়োগ করে ভারতে পাঠায় (২৪ মার্চ, ১৯৪৭ খ্রি.)। 

[2]মাউন্টব্যাটেনের লক্ষ্য: মাউন্টব্যাটেনের লক্ষ্য ছিল অখণ্ড ভারত। তাই ২৪ মার্চ থেকে ৬ মে-র মধ্যে তিনি ভারতীয় নেতৃমণ্ডলী ও রাজন্যবর্গের সঙ্গে ১৩৩টি বৈঠক করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই নতুন বড়োলটি বুঝে নেন যে, ভারত বিভাগ ছাড়া ভারতীয় সমস্যার কোনো সমাধান নেই। একাজে বিলম্ব হলে পাঞ্জাব, বাংলাসহ বহু স্থানে হিংসার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়বে আশঙ্কা করে পরামর্শের জন্য মে মাসে তিনি ইংল্যান্ড যান। ব্রিটিশ সরকারের অনুমোদন নিয়ে ফিরে এসে ৩ জুন তিনি ভারত বিভাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তিনি জানান সম্ভবত ১৫ আগস্টের (১৯৪৭ খ্রি.) মধ্যেই ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন করা হবে। মাউন্টব্যাটেনের এই পরিকল্পনা ও ঘোষণা ‘মাউন্টব্যাটেন প্রস্তাব’ বা ‘মাউন্টব্যাটেন রোয়েদাদ’ (Mountbatten Award) নামে খ্যাত।


বিভিন্ন প্রস্তাব

মাউন্টব্যাটেনের প্রস্তাবে বলা হয় — 

[1] ভারতবর্ষকে বিভক্ত করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি ডোমিনিয়নের সৃষ্টি করা হবে। ডোমিনিয়ন দুটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিষয়সমূহ পরিচালনা করবে। 

[2] মুসলমান প্রধান প্রদেশ — সিন্ধু, ব্রিটিশ বালুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, পশ্চিম পাঞ্জাব ও পূর্ব বাংলা নিয়ে 'পাকিস্তান' গড়া হবে। 

[3] পাঞ্জাব ও বাংলাকে বিভক্ত করে কোন অঞ্চলকে কোন ডোমিনিয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হবে তা নির্ধারণের জন্য একটি ‘সীমানা নির্ধারণ কমিশন’ ক্ষমতা হস্তান্তরের আগেই গঠিত হবে। 

[4] আসামের শ্রীহট্ট জেলা কোন ডোমিনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হবে তা গণভোটে স্থির হবে। 

[5] দেশীয় রাজাগুলি নিজ নিজ রাজ্যে সার্বভৌম ক্ষমতা লাভ করবে এবং ইচ্ছা করলে তারা যে-কোনো ডোমিনিয়নে যোগ দিতে পারবে। 

[6] প্রতি ডোমিনিয়নের নির্বাচিত গণপরিষদ নিজ এলাকার সংবিধান রচনা করবে। 

[7] যতদিন না সংবিধান রচিত হচ্ছে ততদিন ব্রিটিশ সরকার নিযুক্ত একজন গভর্নর-জেনারেল এই ডোমিনিয়নে থাকবেন। 

[8] স্বাধীনতা লাভের পর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কোনো আইন ওই দুই ডোমিনিয়নে বলবৎ থাকবে না। প্রতি ডোমিনিয়নের নির্বাচিত আইনসভা নিজ নিজ দেশের জন্য আইন রচনা করবে।


মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনার মাধ্যমে ভারত বিভাজন পদ্ধতি:

[1] শীর্ষনেতৃবর্গের সঙ্গে আলোচনার সূত্রে : ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেন প্রায় দেড় মাসের মধ্যে (১৯৪৭ খ্রি., ৬ মে-র মধ্যে) গান্ধিজি, জওহরলাল, বল্লভভাই প্যাটেল, জিন্না ও দেশীয় রাজাদের সঙ্গে প্রায় ১৩৩ বার বৈঠকে বসেন। কিন্তু তাঁর সদর্থক ইচ্ছার অভাবে ও জিন্নার একগুঁয়েমির জন্য সকল আলোচনাই ভেস্তে যায়। মাউন্টব্যাটেন সিদ্ধান্তে এলেন যে, ক্যাবিনেট মিশন বা মন্ত্রীমিশন নির্ধারিত ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে এক বিকল্প পরিকল্পনা রচনা করা দরকার।

[2] বলকান পরিকল্পনা রচনার মাধ্যমে : বিকল্প পরিকল্পনা হিসেবে মাউন্টব্যাটেন বলকান পরিকল্পনা (Plan Balkan) অনুসরণ করেন। এই পরিকল্পনায় পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগের প্রস্তাব রাখা হয় এবং বলা হয় যেসকল প্রদেশ বা উপপ্রদেশ সাংবিধানিক সভায় যোগ দেবে তাদেরও ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু নেহরু ও জিন্না এই পরিকল্পনাকে গ্রহণ না করায় বলকান পরিকল্পনা তার কার্যকারিতা হারায়। ভারত বিভাজনের সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে।

[3] প্ল্যান পার্টিশানের রূপায়ণের দ্বারা : মাউন্টব্যাটেন হতোদ্যম না হয়ে দেশভাগ ও ক্ষমতা হস্তান্তরের উপর আরও বেশি করে জোর দেন। তিনি ভারত বিভাজনের লক্ষ্যে প্ল্যান পার্টিশান নামক এক পরিকল্পনা পেশ করেন। নেহরু ও ভি.পি. মেননের সাহায্য নিয়ে তিনি এই পরিকল্পনা রচনা করেন। এই পরিকল্পনায় বলা হয়—ভারত ও পাকিস্তান দুপক্ষের ডোমিনিয়ন সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। মাউন্টব্যাটেনের এই কু-চাল বুঝেও নেহরু অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে একে মেনে নেন। জিন্নাও এই প্রস্তাব মেনে নিলে মাউন্টব্যাটেন ক্ষমতা- হস্তান্তরের তারিখ ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের জুন মাস থেকে এগিয়ে নিয়ে এসে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট নির্ধারণ করেন।

[4] ভারতীয় স্বাধীনতা আইন পাশের মাধ্যমে : মাউন্টব্যাটেনের প্রস্তাব মেনে ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় স্বাধীনতা বিল রচনা করে। আইনসভায় পাশ হওয়ার (১৬ জুলাই) পর সম্রাট ষষ্ঠ জর্জ বিলটিতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন (১৮) জুলাই)। বিলটি আইনে পরিণত হলে বড়োলাট মাউন্টব্যাটেন তা কার্যকর করে ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন ডোমিনিয়নের প্রতিষ্ঠা ঘটান।

[5] কংগ্রেস ও লিগের সাহায্য নিয়ে : গান্ধিজি ও মৌলানা আজাদ দেশভাগের ঘোর বিরোধী হলেও নেহরু ও প্যাটেলের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস কার্যকরী সমিতি শেষপর্যন্ত ভারত বিভাজনে সায় দিয়েছিল। কংগ্রেসের পাশাপাশি মুসলিম লিগও মাউন্টব্যাটেন প্রস্তাব মেনে নিলে ভারত বিভাজন সম্ভব হয়। আসলে পাঞ্জাব ও বাংলায় হাজার হাজার মুসলিম যেভাবে আলাদা রাষ্ট্রের দাবিতে সক্রিয় হয়ে উঠছিল তাকেই বৈধতা দিয়েছিলেন মাউন্টব্যাটেন। উইনস্টন চার্চিলের প্ররোচনায় প্ররোচিত হয়ে জিন্নার নেতৃত্বাধীন মুসলিম লিগ আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবিতে অনড় থাকায় মাউন্টব্যাটেনের পক্ষে ভারত বিভাজন করা সহজ হয়।


মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা ও ভারতীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়া :

মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনার বিরোধীতা করেছিল ভারতের বিভিন্ন দল ও সম্প্রদায়ের নেতৃবর্গ।

[1] জওহরলাল নেহরু এক নেতার ভাষনে আক্ষেপের সুরে বলেন- আমি এই প্রস্তাব (ভারত বিভাজনে) হৃদয়ের কোনো আনন্দের সঙ্গে তুলছি না। যদিও এ বিষয়ে আমার মনে কোনো সংশয় নেই যে এটি হল শ্রেষ্ঠ বিকল্প।

[2] মহাত্মা গান্ধি মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন—আমি স্পষ্ট রূপে দেখতে পাচ্ছি সমস্যা সমাধানের পক্ষে আমরা ভুলভাবে এগোচ্ছি।

[3] মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এই পরিকল্পনা মেনে দেশভাগ হলে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন—দেশভাগ হল এক দৈব দুর্বিপাক।

[4] সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল দেশভাগের এই পরিকল্পনাকে মন থেকে মেনে নিতে না পারলেও বলেন—দেশভাগ ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।

[5] ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশভাগের নির্দেশ সম্বলিত এই পরিকল্পনার প্রতি প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন—গৃহযুদ্ধের থেকে দেশভাগ ভালো ।

[6] মহম্মদ আলি জিন্না বলেন—মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনায় ঘোষিত পাকিস্তান আসলে বিকলাঙ্গ ও কীটদগ্ধ।

মন্তব্য: ভারত বিভাজন তথা ভারত ও পাকিস্তান এই দুটি আলাদা রাষ্ট্র সৃষ্টির জন্য মাউন্টব্যাটেন তাঁর দায় এড়াতে পারেন না। আসলে গৃহযুদ্ধ বন্ধ করার অজুহাতে মাউন্টব্যাটেন সুচতুরভাবে ভারত বিভাজনের পরিকল্পনা রূপায়ণ করেন। এ প্রসঙ্গে মৌলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর 'India wins Freedom' নামক আত্মজীবনীতে লিখেছেন—মাউন্টব্যাটেন প্রথম পাকিস্তান গঠনের অনুকূলে মত দেন এবং শাসন পরিষদের কংগ্রেস সদস্যদের মনে এই মতলবের বীজ বপন করেন।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অবশিল্পায়ন কি ? ঔপনিবেশিক ভারতে অবশিল্পায়নের কারণ ও ফলাফল লেখো ।

অবশিল্পায়নঃ        অবশিল্পায়ন বলতে বোঝায় শিল্পায়নের বিপরীত বা শিল্পের অধোগতি। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনধীন ভারতের চিরাচরিত ও ঐতিহ্যশালী হস্তশিল্প-কুটিরশিল্পের ধ্বংস সাধনই মূলত অবশিল্পায়ন। সব্যসাচী ভট্টাচার্যের মতে যদি দেশের মানুষ শিল্প-কর্ম ছেড়ে চাষ-আবাদে জীবিকা অর্জন শুরু করে অথবা জাতীয় কৃষিজ ও অংশ বাড়তে থাকে এবং শিল্পজ অংশ কমতে থাকে তাকে অব-অবশিল্পায় বলে। অবশিল্পায়নের ফলে ভারতের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের অবশিল্পায়ন সম্পর্কে প্রথম পর্বে দাদাভাই নাও রোজি, রমেশ চন্দ্র দত্ত, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনীপাম দত্ত জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনী পামদত্ত, গ্যাডগিল, বি.ডি. বসু, নরেন্দ্রকৃয় সিংহ, বিপান চন্দ্র, অমিয় বাগচি প্রমুখ ঐতিহাসিক আলোচনা করেছেন। অব-শিল্পায়নের কারণঃ (১) কাঁচামালের রপ্তানি: ভারতীয় শিল্পের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে কাঁচামাল রপ্তানি শুরু হয়। ভারত ইংল্যান্ডের কলকারখানার খোলা বাজার ও কাঁচামাল সরবরাহের উৎসে পরিণত হয়। ভারত থেকে তুলো, নীল, কফি, চা, রেশম প্রভৃতি ইং...

জোটনিরপেক্ষ নীতি কী ? জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব লেখো।

জোটনিরপেক্ষ নীতিঃ     দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে একদিকে সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী বা সমাজতান্ত্রিক জোট, অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়। এই দুই জোটের কোনোটিতেই যোগ না দিয়ে, স্বাধীনভাবে উভয় জোটের সঙ্গেই বন্ধুত্ব বা সমদূরত্ব বজায় রেখে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার নীতি জোটনিরপেক্ষ নীতি নামে পরিচিত। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের কারণ বা উদ্দেশ্য ঃ    মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী জোট ও সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী জোটের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত ‘ঠান্ডা লড়াই'-এর আর্বত থেকে নিজেকে দূরে রেখে, জাতীয় স্বার্থ ও নবলব্ধ স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য ভারত জোটনিরপেক্ষ বিদেশনীতি গ্রহণ করে। ভারতে জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের কারণগুলি হল— [1] ভৌগোলিক সুরক্ষা : এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে এমন একটা জায়গায় ভারতের অবস্থান যা তাকে মধ্যপ্রাচ্য। ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী দেশে পরিণত করেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চিন, ব্রহ্মদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশি...

চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপ সম্পর্কে আলোচনা করো।

অথবা, রাজরাজ ও প্রথম রাজেন্দ্র চোলের নেতৃত্বে নৌ সাম্রাজ্যের বিস্তারের ইতিহাস লেখো। চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপঃ       প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে চোল যুগ সামুদ্রিক কার্যকলাপের জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। রাজরাজের শাসনকাল থেকে প্রথম কুলোতুঙ্গের শাসনকাল পর্যন্ত প্রায় ১৩৫ বছর চোল রাজারা সামুদ্রিক সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। ঐতিহাসিক পানিক্করের মতে, প্রাচীন ভারতের শুধু চোল রাজারাই সামুদ্রিক শক্তির বিস্তারে উৎকর্ষ দেখিয়েছিলেন। চোল রাজাদের নৌ সাম্রাজ্য বিস্তারের পিছনে বাণিজ্যের বিস্তার, উপনিবেশ স্থাপন, আরব আক্রমণ প্রতিহত করা প্রভৃতি বিষয়গুলি মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।        রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল পিতা-পুত্র চোলদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় চোল ইতিহাস শতাব্দীকাল ব্যাপী ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। চোল রাজ্য ছিল একটি ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাজ্য, যাকে রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল ভারতের মূল ভূখন্ড ছাড়িয়ে তাদের নৌবহরের দাপটে বঙ্গোপসাগরকে এক বিরাট সামুদ্রিক সাম্রাজ্যে পরিণত করে। তাই বলা যায় তার...

১৫২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল-আফগান দ্বন্দ্বের বিবরণ দাও।

মুঘল-আফগান দ্বন্দ্ব:      ভারতে মুঘল শক্তির উত্থান ও বিকাশের সঙ্গে মুঘল আফগানি দ্বন্দ্বের সমান্তরাল অবস্থান দেখা যায়। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল আফগান দ্বন্দ্ব চলতে থাকে।      খানুয়ার যুদ্ধ: ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে মেবারের রানা সংগ্রাম সিংহের সঙ্গে বাবরের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধে রানা সংগ্রাম সিংহ পরাজিত হন। এই যুদ্ধে রাজপুতদের সঙ্গে আফগানরা সহযোগিতা করেনি। রাজপুতদের সঙ্গে সঙ্গে আফগানরাও যদি মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করত তাহলে হয়ত ভারতের ইতিহাসের গতি অন্য পথে প্রবাহিত হতে পারত।     ঘর্ঘরার যুদ্ধ (১৫২৯ খ্রিস্টাব্দ): বাবর আফগানদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে বিহারের সীমান্তে পৌঁছান। পূর্ব ভারতে মুঘল আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য জৌনপুরের শাসনকর্তা মামুদ লোদি বিহারের আফগান নেতা শেরশাহ, এবং বাংলার সুলতান মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত ঐক্যশক্তি জোট গঠন করেন। বাবর নুসরৎশাহের কাছে দূত পাঠিয়ে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করতে বলেন। এর পর মামুদ লোদি, ও শেরশাহ মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বাবর এলাহাবাদ, বারাণসী দখল করে বিহারের আরো জেলা অধিকার করার জন্...

একজন ঐতিহাসিক হিসেবে আবুল ফজলের মূল্যায়ন করো ।

আবুল ফজল:       ভারতবর্ষে মুসলমান শক্তির উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা যেমন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন প্রবণতার সৃষ্টি করেছিল, তেমনি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও নতুন এক যুগ বহন করে এনেছিল। মোগল যুগের ইতিহাসচর্চা বিশেষ করে দরবারী ইতিহাসের শ্রেষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন আবুল ফজল। আকবরের মন্ত্রী, বন্ধু, রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিবিদ ও সামরিক অফিসার আবুল ফজল ইতিহাস রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। শৈশবেই তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে ছিলেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি জ্ঞানার্জনের সমস্ত শাখায় দক্ষতা লাভ করেন। নির্যাতিত ও অত্যাচারিত পরিবারের দুর্ভাগ্য আবুল ফজলের চিন্তার উপর গভীর ছাপ ফেলেছিল। মোগল সম্রাট আকবরের আশ্রয় ও পৃষ্টপোষকতা লাভ করার পর তিনি রচনা করেন দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ-‘আকবরনামা’ ও ‘আইন-ই-আকবরী’।         মধ্যযুগের ভারতের ঐতিহাসিকদের মধ্যে আবুল ফজল ছিলেন সবচেয়ে প্রতিভাবান। ‘আকবরনামা’-র দ্বিতীয় খন্ডে তিনি ইতিহাস ও ইতিহাস তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর মতামত রেখেছেন। পূর্বসূরীদের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীর সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি বলেছেন, ‘এদের কাছে ইতিহাস হল মুসলমানদের ভারত জয়, শাসন এবং হিন...