গৌড়ের উত্থানে শশাঙ্কের কৃতিত্ব:
গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর গৌড়ের স্বাধীনতা বিপন্ন হলে কনৌজের মৌখরী রাজারা গৌড় দখলের চেষ্টা করেন। অন্যদিকে, চালুক্য বংশীয় রাজাদের নিরন্তর আক্রমণ গৌড়ের অস্তিত্বকে দুর্বল করে তুলেছিল। গৌড়ের এই টলায়মান অবস্থায় শশাঙ্ক ক্ষমতা দখল করে এক স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। শশাঙ্কের রাজত্ব সম্পর্কে জানতে আমাদের মূলত নির্ভর করতে হয় বাণভট্টের 'হর্ষচরিত' ও হিউয়েন সাঙের ভ্রমণবৃত্তান্ত 'সি-ইউ-কি'-র ওপর।
বংশ পরিচয় ও উত্থান:
শশাঙ্কের বংশ পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায় না। রোহতাসগড়ের (রোহিতাশ্ব) গিরিগাত্রে 'শ্রীমহাসামন্ত শশাঙ্ক' নামটি খোদিত আছে। ঐতিহাসিকদের মতে, এই শশাঙ্ক এবং গৌড়রাজ শশাঙ্ক অভিন্ন ব্যক্তি। এর থেকে প্রতীয়মান হয় যে, শশাঙ্ক প্রথম জীবনে একজন সামন্ত নরপতি ছিলেন। ড. বি.সি. সেন মনে করেন, শশাঙ্ক মৌখরীদের অধীন সামন্ত রাজা ছিলেন। তবে ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন "শশাঙ্কই প্রথম বাঙালি রাজা যিনি আর্যাবর্তে সার্বভৌম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।" শশাঙ্ক নিজ বাহুবলে এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হন এবং মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন।
রাজ্য বিস্তার:
সিংহাসনে বসেই তিনি রাজ্য বিস্তারে উদ্যোগী হন। গৌড়ের অধিপতি হিসেবে উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গের ওপর প্রথম থেকেই তাঁর আধিপত্য ছিল। মেদিনীপুর লিপি থেকে জানা যায়, তিনি দণ্ডভুক্তি (মেদিনীপুর জেলা) ও উৎকল জয় করেন। ওড়িশার কোঙ্গদ অঞ্চলে রাজত্বকারী শৈলোদ্ভব রাজবংশও তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে। এছাড়া কামরূপরাজ ভাস্করবর্মণকে পরাজিত করার কৃতিত্বও অনেক পণ্ডিত শশাঙ্ককে দিয়ে থাকেন।
কনৌজ ও থানেশ্বরের সাথে সংঘর্ষ:
শশাঙ্কের অন্যতম রাজনৈতিক কৃতিত্ব ছিল কনৌজের মৌখরীদের বিরুদ্ধে সফল অভিযান। শশাঙ্ক মালবরাজ দেবগুপ্তের সাথে মৈত্রী স্থাপন করে কনৌজ আক্রমণ করেন। যুদ্ধে কনৌজরাজ গ্রহবর্মন নিহত হন এবং তাঁর পত্নী (হর্ষবর্ধনের ভগিনী) রাজ্যশ্রীকে বন্দী করা হয়। রাজ্যশ্রীকে উদ্ধার করতে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ও থানেশ্বরের রাজা রাজ্যবর্ধন এগিয়ে আসেন এবং দেবগুপ্তকে পরাজিত করেন। কিন্তু এক সংঘর্ষে (বা রাজনৈতিক কৌশলে) শশাঙ্ক রাজ্যবর্ধনকে হত্যা করেন।
এই পরিস্থিতিতে থানেশ্বরের নতুন রাজা হর্ষবর্ধন শশাঙ্কের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। হর্ষবর্ধন তাঁর ভগিনী রাজ্যশ্রীকে উদ্ধার করতে পারলেও শশাঙ্ককে সম্পূর্ণ পরাজিত করতে পেরেছিলেন কিনা, তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ বাণভট্ট বা হিউয়েন সাঙের বর্ণনায় শশাঙ্কের চূড়ান্ত পরাজয়ের উল্লেখ নেই। এমনকি শশাঙ্কের মৃত্যু পর্যন্ত মগধ তাঁর অধিকারেই ছিল।
ধর্মীয় নীতি ও বিতর্ক:
ব্যক্তিগত জীবনে শশাঙ্ক ছিলেন পরম শৈব। হিউয়েন সাঙের বিবরণ অনুযায়ী, শশাঙ্ক বৌদ্ধদের ওপর নানা নির্যাতন চালিয়েছিলেন—যেমন কুশীনগর বিহার থেকে বৌদ্ধদের বিতাড়ন, পাটলিপুত্রে বুদ্ধের চরণচিহ্ন সম্বলিত পাথর গঙ্গায় নিক্ষেপ এবং বোধিবৃক্ষ ছেদন। তবে আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন এই বর্ণনাগুলো কিছুটা অতিরঞ্জিত। হিউয়েন সাং নিজে লিখেছেন যে, তিনি তাম্রলিপ্ত ও কর্ণসুবর্ণে বৌদ্ধ স্তূপ এবং গৌড়ের মঠগুলোতে বৌদ্ধদের নিশ্চিন্তে বসবাস করতে দেখেছেন। সম্ভবত বৌদ্ধরা হর্ষবর্ধনের অনুরাগী হওয়ায় শশাঙ্ক রাজনৈতিক কারণে তাঁদের ওপর কঠোর হয়েছিলেন।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, শশাঙ্ক কেবল একটি শক্তিশালী রাজ্যই গঠন করেননি, বরং উত্তর ভারতীয় রাজনীতিতে বাংলাকে এক মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁর প্রদর্শিত পথেই পরবর্তীকালে পাল রাজারা সাম্রাজ্য বিস্তারে উদ্যোগী হন। প্রশাসক হিসেবে তিনি যে স্বতন্ত্র ও আমলাতান্ত্রিক শাসনরীতির প্রবর্তন করেছিলেন, ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় তাকে 'গৌড়তন্ত্র' আখ্যা দিয়েছেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন