সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সম্রাট স্কন্দগুপ্তের কৃতিত্ব বা হুন প্রতিরোধে স্কন্দগুপ্তের ভূমিকা বিশ্লেষণ করো।

স্কন্দগুপ্তের কৃতিত্ব: 

গুপ্ত সাম্রাজ্যের ইতিহাসে স্কন্দগুপ্ত এক গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল নাম। তিনি সাধারণত গুপ্তদের শেষ শক্তিশালী সম্রাট হিসেবে বিবেচিত। পিতা প্রথম কুমারগুপ্ত-এর মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য যখন বহিঃশত্রু ও অন্তর্দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত, তখন স্কন্দগুপ্ত দৃঢ় নেতৃত্ব ও সামরিক দক্ষতার মাধ্যমে সাম্রাজ্যকে রক্ষা করেন। তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে প্রধান তথ্য পাওয়া যায় ভিতারি স্তম্ভলিপি এবং জুনাগড় শিলালিপি থেকে।


পুষ্যমিত্র ও বাকাটক আক্রমণ প্রতিহত:

কুমারগুপ্তের শাসনের শেষদিকে সাম্রাজ্যের উপর পুষ্যমিত্র নামে এক শক্তির আক্রমণ নেমে আসে। ধারণা করা হয়, এই আক্রমণে বাকাটক রাজ্যেরও সমর্থন ছিল। তরুণ স্কন্দগুপ্ত তখনই সেনানায়ক হিসেবে অসাধারণ যোগ্যতার পরিচয় দেন। তিনি সফলভাবে শত্রুদের প্রতিহত করে সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা বজায় রাখেন। এই সামরিক সাফল্যই তাঁর সিংহাসনে আরোহণের পথ সুগম করে এবং রাজ্যের অভ্যন্তরে তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।


হুন আক্রমণ ও স্কন্দগুপ্তের প্রতিরোধ:

স্কন্দগুপ্তের সর্বশ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে হুনদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। পঞ্চম শতকের মাঝামাঝি সময়ে মধ্য এশিয়া থেকে আগত শ্বেতহুনরা উত্তর-পশ্চিম ভারত আক্রমণ করে। দীর্ঘদিন সীমান্ত সুরক্ষায় শৈথিল্যের সুযোগ নিয়ে তারা গুপ্ত সাম্রাজ্যে প্রবেশ করে। ভিতারি স্তম্ভলিপিতে উল্লেখ আছে যে, সম্রাট শত্রুদের বিরুদ্ধে ভয়ংকর যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের পরাজিত করেন।

এই বিজয় শুধু একটি সামরিক সাফল্য ছিল না; এটি ছিল সমগ্র উত্তর ভারতের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদি হুনরা তখনই স্থায়ীভাবে আধিপত্য বিস্তার করতে পারত, তবে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন আরও ত্বরান্বিত হতো। স্কন্দগুপ্ত তাঁদের অগ্রযাত্রা রোধ করে সাম্রাজ্যকে সাময়িকভাবে পুনরুজ্জীবিত করেন। এই সাফল্যের পর তিনি ‘বিক্রমাদিত্য’ উপাধি গ্রহণ করেন। বিশিষ্ট ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁকে “ভারতের রক্ষাকারী” বলে অভিহিত করেছেন, যা তাঁর অবদানের গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

স্কন্দগুপ্ত শুধু যোদ্ধা নন, দক্ষ প্রশাসকও ছিলেন। জুনাগড় শিলালিপি থেকে জানা যায়, অতিবৃষ্টিতে সুদর্শন হ্রদের বাঁধ ভেঙে যায়। তাঁর গভর্নর পর্ণদত্তের পুত্র চক্রপালিত এটি মেরামত করেন। এই কাজ কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে জলসেচ ব্যবস্থা উন্নত করে প্রজাদের কল্যাণ সাধন করে। তিনি ধর্মীয় ও শিক্ষাক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা দেন।

যুদ্ধের অবিরাম খরচ রাজকোষকে দুর্বল করে। পরবর্তী সম্রাটরা (পুরুগুপ্ত, বুদ্ধগুপ্ত প্রমুখ) এই শক্তি ধরে রাখতে পারেননি। হুনরা পরে ফিরে আসে এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতায় সাম্রাজ্য খণ্ডিত হয়। তবু স্কন্দগুপ্তের শাসন গুপ্ত যুগের শেষ উজ্জ্বল অধ্যায়।

উপসংহারে বলা যায়, স্কন্দগুপ্ত সংকটকালীন এক মহান সম্রাট। বহিঃশত্রু, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে তিনি সাম্রাজ্য রক্ষা করেন। হুন প্রতিরোধে তাঁর ভূমিকা গুপ্ত সাম্রাজ্যকে এবং সমগ্র উত্তর ভারতকে সাময়িক ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচায়। তাই ভারতীয় ইতিহাসে তাঁর নাম এক রক্ষাকবচ ও বীর সম্রাট হিসেবে চিরস্মরণীয়।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অবশিল্পায়ন কি ? ঔপনিবেশিক ভারতে অবশিল্পায়নের কারণ ও ফলাফল লেখো ।

অবশিল্পায়নঃ        অবশিল্পায়ন বলতে বোঝায় শিল্পায়নের বিপরীত বা শিল্পের অধোগতি। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনধীন ভারতের চিরাচরিত ও ঐতিহ্যশালী হস্তশিল্প-কুটিরশিল্পের ধ্বংস সাধনই মূলত অবশিল্পায়ন। সব্যসাচী ভট্টাচার্যের মতে যদি দেশের মানুষ শিল্প-কর্ম ছেড়ে চাষ-আবাদে জীবিকা অর্জন শুরু করে অথবা জাতীয় কৃষিজ ও অংশ বাড়তে থাকে এবং শিল্পজ অংশ কমতে থাকে তাকে অব-অবশিল্পায় বলে। অবশিল্পায়নের ফলে ভারতের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের অবশিল্পায়ন সম্পর্কে প্রথম পর্বে দাদাভাই নাও রোজি, রমেশ চন্দ্র দত্ত, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনীপাম দত্ত জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনী পামদত্ত, গ্যাডগিল, বি.ডি. বসু, নরেন্দ্রকৃয় সিংহ, বিপান চন্দ্র, অমিয় বাগচি প্রমুখ ঐতিহাসিক আলোচনা করেছেন। অব-শিল্পায়নের কারণঃ (১) কাঁচামালের রপ্তানি: ভারতীয় শিল্পের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে কাঁচামাল রপ্তানি শুরু হয়। ভারত ইংল্যান্ডের কলকারখানার খোলা বাজার ও কাঁচামাল সরবরাহের উৎসে পরিণত হয়। ভারত থেকে তুলো, নীল, কফি, চা, রেশম প্রভৃতি ইং...

জোটনিরপেক্ষ নীতি কী ? জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব লেখো।

জোটনিরপেক্ষ নীতিঃ     দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে একদিকে সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী বা সমাজতান্ত্রিক জোট, অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়। এই দুই জোটের কোনোটিতেই যোগ না দিয়ে, স্বাধীনভাবে উভয় জোটের সঙ্গেই বন্ধুত্ব বা সমদূরত্ব বজায় রেখে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার নীতি জোটনিরপেক্ষ নীতি নামে পরিচিত। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের কারণ বা উদ্দেশ্য ঃ    মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী জোট ও সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী জোটের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত ‘ঠান্ডা লড়াই'-এর আর্বত থেকে নিজেকে দূরে রেখে, জাতীয় স্বার্থ ও নবলব্ধ স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য ভারত জোটনিরপেক্ষ বিদেশনীতি গ্রহণ করে। ভারতে জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের কারণগুলি হল— [1] ভৌগোলিক সুরক্ষা : এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে এমন একটা জায়গায় ভারতের অবস্থান যা তাকে মধ্যপ্রাচ্য। ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী দেশে পরিণত করেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চিন, ব্রহ্মদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশি...

চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপ সম্পর্কে আলোচনা করো।

অথবা, রাজরাজ ও প্রথম রাজেন্দ্র চোলের নেতৃত্বে নৌ সাম্রাজ্যের বিস্তারের ইতিহাস লেখো। চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপঃ       প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে চোল যুগ সামুদ্রিক কার্যকলাপের জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। রাজরাজের শাসনকাল থেকে প্রথম কুলোতুঙ্গের শাসনকাল পর্যন্ত প্রায় ১৩৫ বছর চোল রাজারা সামুদ্রিক সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। ঐতিহাসিক পানিক্করের মতে, প্রাচীন ভারতের শুধু চোল রাজারাই সামুদ্রিক শক্তির বিস্তারে উৎকর্ষ দেখিয়েছিলেন। চোল রাজাদের নৌ সাম্রাজ্য বিস্তারের পিছনে বাণিজ্যের বিস্তার, উপনিবেশ স্থাপন, আরব আক্রমণ প্রতিহত করা প্রভৃতি বিষয়গুলি মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।        রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল পিতা-পুত্র চোলদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় চোল ইতিহাস শতাব্দীকাল ব্যাপী ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। চোল রাজ্য ছিল একটি ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাজ্য, যাকে রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল ভারতের মূল ভূখন্ড ছাড়িয়ে তাদের নৌবহরের দাপটে বঙ্গোপসাগরকে এক বিরাট সামুদ্রিক সাম্রাজ্যে পরিণত করে। তাই বলা যায় তার...

১৫২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল-আফগান দ্বন্দ্বের বিবরণ দাও।

মুঘল-আফগান দ্বন্দ্ব:      ভারতে মুঘল শক্তির উত্থান ও বিকাশের সঙ্গে মুঘল আফগানি দ্বন্দ্বের সমান্তরাল অবস্থান দেখা যায়। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল আফগান দ্বন্দ্ব চলতে থাকে।      খানুয়ার যুদ্ধ: ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে মেবারের রানা সংগ্রাম সিংহের সঙ্গে বাবরের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধে রানা সংগ্রাম সিংহ পরাজিত হন। এই যুদ্ধে রাজপুতদের সঙ্গে আফগানরা সহযোগিতা করেনি। রাজপুতদের সঙ্গে সঙ্গে আফগানরাও যদি মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করত তাহলে হয়ত ভারতের ইতিহাসের গতি অন্য পথে প্রবাহিত হতে পারত।     ঘর্ঘরার যুদ্ধ (১৫২৯ খ্রিস্টাব্দ): বাবর আফগানদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে বিহারের সীমান্তে পৌঁছান। পূর্ব ভারতে মুঘল আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য জৌনপুরের শাসনকর্তা মামুদ লোদি বিহারের আফগান নেতা শেরশাহ, এবং বাংলার সুলতান মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত ঐক্যশক্তি জোট গঠন করেন। বাবর নুসরৎশাহের কাছে দূত পাঠিয়ে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করতে বলেন। এর পর মামুদ লোদি, ও শেরশাহ মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বাবর এলাহাবাদ, বারাণসী দখল করে বিহারের আরো জেলা অধিকার করার জন্...

একজন ঐতিহাসিক হিসেবে আবুল ফজলের মূল্যায়ন করো ।

আবুল ফজল:       ভারতবর্ষে মুসলমান শক্তির উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা যেমন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন প্রবণতার সৃষ্টি করেছিল, তেমনি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও নতুন এক যুগ বহন করে এনেছিল। মোগল যুগের ইতিহাসচর্চা বিশেষ করে দরবারী ইতিহাসের শ্রেষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন আবুল ফজল। আকবরের মন্ত্রী, বন্ধু, রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিবিদ ও সামরিক অফিসার আবুল ফজল ইতিহাস রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। শৈশবেই তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে ছিলেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি জ্ঞানার্জনের সমস্ত শাখায় দক্ষতা লাভ করেন। নির্যাতিত ও অত্যাচারিত পরিবারের দুর্ভাগ্য আবুল ফজলের চিন্তার উপর গভীর ছাপ ফেলেছিল। মোগল সম্রাট আকবরের আশ্রয় ও পৃষ্টপোষকতা লাভ করার পর তিনি রচনা করেন দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ-‘আকবরনামা’ ও ‘আইন-ই-আকবরী’।         মধ্যযুগের ভারতের ঐতিহাসিকদের মধ্যে আবুল ফজল ছিলেন সবচেয়ে প্রতিভাবান। ‘আকবরনামা’-র দ্বিতীয় খন্ডে তিনি ইতিহাস ও ইতিহাস তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর মতামত রেখেছেন। পূর্বসূরীদের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীর সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি বলেছেন, ‘এদের কাছে ইতিহাস হল মুসলমানদের ভারত জয়, শাসন এবং হিন...