সুয়েজ সংকটের তাৎপর্য ও এই সংকটে ভারতের ভূমিকা:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ মিশরে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাবেদার শাসক বসিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও মিশরে ব্রিটিশ অধিপত্যের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৫৬সালে মিশরের রাষ্ট্রপতি নাসের নির্বাচিত হন।
পরবর্তী সময় নাসেরের সাথে পশ্চিমি শক্তিবর্গের বিরোধ শুরু হয়। ১৯৫৬সালে ব্রিটেন মিশরের সুয়েজখালের রক্ষণাবেক্ষণের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে চাইলে নাসের তাতে রাজি হয় না। রুশ আগ্রাসন প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে আমেরিকার নেতৃত্বে বাগদাদ চুক্তি থেকে মিশর দূরে থাকার জন্য, পশ্চিমজোট অসন্তুষ্ট হয়। মধ্যপ্রাচ্যে আবার জাতীয়বাদের বিরোধী ইজরায়েলের উত্থান নাসের মেনে নিতে পারেনি।
'ইউনিভার্সাল সুয়েজ ক্যানাল কোম্পানি' ৯৫বছরের মেয়াদে সুয়েজখাল পরিচালনার দায়িত্ব পায়। মিশরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলেও সুয়েজখাল থেকে আদায় হওয়া অর্থের খুব সামান্য অংশ মিশর পেত। সুয়েজখালও তার নিকটবর্তী অঞ্চলে মিশরের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। তখন নাসের মিশরের নীলনদের ওপর আসওয়ান বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করেন। এই বাঁধ নির্মিত হলে মিশরের ৮,৬০,০০০ হেক্টর জমি আবাদযোগ্য হত এবং বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হত। তাসওয়ান বাঁধ নির্মাণের জন্য আনুমানিক ব্যয় ধরা হয় ১৪০০ মিলিয়ন ডলার। ইংল্যান্ড আমেরিকা ও বিশ্বব্যাংক প্রাথমিকভাবে ৭০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে রাজি হয়। কিন্তু একবছর পর সেই ঋণ প্রস্তাব বাতিল করে। নাসের ১৯৫৬সালে সুয়েজখাল ও সুয়েজ ক্যানাল কোম্পানি জাতীয়করণ করার সে কথা ঘোষণা করেন তাতে জানান যে, সুয়েজখাল থেকে সংগৃহীত অর্থ আসওয়ান বাঁধ নির্মাণে ব্যয় করা হবে। কোম্পানির বিদেশি অংশীদারদের প্রচলিত বাজারদর অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক যোগসূত্র হিসাবে সব দেশের জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করতে পারবে।
ব্রিটেন সুয়েজ খালের পথে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কাচা তেল আমদানি করত এবং তাই ব্রিটেন জাতীয়করণের ফলে ব্রিটেন ক্ষুব্ধ হয়। ফ্রান্স আগেই মিশরকে ধ্বংস করতে উদ্যোগী হয়। যখন মিশর ফ্রান্সের উপনিবেশ আলজেরিয়াকে সহায়তা করে। ব্রিটেন, ফ্রান্স বা ইজরায়েল একজোট হয়ে মিশর আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। লন্ডন সম্মেলন ডাকা হয় ১৯৫৬তে এবং ২২টি দেশ যোগদান করে। ১৮টি দেশ জাতীয়করণ সমর্থন করে না এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের কথা বলে। ভারতসহ বাকি দেশ এই জাতীয়করণের পক্ষে মত দেয়। মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব জন ফস্টার ডালেস 'সুয়েজ খাল ব্যবহারকারীদের সংস্থান' গঠন করে এই সংস্থার মাধ্যমে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেন। জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে ব্রিটেন ও ফ্রান্স সুয়েজ খালের ওপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের কথা বলে। তারপর নাসেরের আপত্তি ও সোভিয়েত রাশিয়ার 'ভোটো' প্রয়োগের ফলে এই প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়।
পশ্চিমি শক্তি মিলে ইজরায়েলের সাথে মিলে মিশর আক্রমণ করে। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণসভা ২নভেম্বর যুদ্ধ বিরতির আবেদন জানায়। জাতিপুঞ্জের নির্দেশে মিশর থেকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইজরায়েল তাদের সৈন্য অপসারণে বাধ্য হয়। মধ্যপ্রাচ্যে রুশ প্রভাব প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে মার্কিন রাষ্ট্রপতি Eisenhower তাঁর নীতি ঘোষণা করেন। এতে বলা হয় আন্তর্জাতিক সাম্যবাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কোনো দেশ অর্থাৎ রাশিয়া কর্তৃক আক্রান্ত দেশকে আমেরিকা সহায়তা করবে। এই নীতি কার্যকর করার উদ্দেশ্যে আমেরিকা দুবছরের জন্য ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ান ডলার অর্থ বরাদ্দ করে। মধ্যপ্রাচ্য ক্রমশ ঠান্ডা লড়াই রাজনীতির আবর্তে জড়িয়ে পড়ে।
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের সাধারণসভা ২নভেম্বর যুদ্ধবিরতির আবেদন জানায়। কিছুদিনের মধ্যে জাতিপুঞ্জের নির্দেশে মিশর থেকে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইজরায়েল তাদের সৈন্য অবসারণে বাধ্য হয়।
এই ঘটনায় মিশরের নাসেরের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। মিশর ও সিরিয়া ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্র গঠন করেন এবং নাসের হন প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি। ইংল্যান্ডে আর্থিক ক্ষতির ফলে অর্থনীতিতে ধসনামে রাশিয়ার ভাবমূর্তি মধ্যপ্রাচ্যে উজ্জ্বল হয়। Eisenhower Doctrine ঘোষণা করে আমেরিকা।
সুয়েজ সংকটের সমাধানে ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। খাল উন্মুক্ত রাখার প্রয়াস নেয় ভারত। ভারত মনে করত যে, ১৮৮৮ সালে 'Constantinople Convention' অনুসারে সুয়েজ খাল মিশরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। খালের ওপর মিশরের সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে এমন ব্যবস্থা করা দরকার যাতে জাতিপুঞ্জের সনদ অনুসারে খাল সংক্রান্ত সব সমস্যার সমাধান করা হয়।
ভারতের তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী কৃষ্ণমেনন ১৯৫৬ সালে লন্ডন সম্মেলনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। এই সম্মেলনে মিশরের কোনো প্রতিনিধি যোগদান না করায় ভারত দুপক্ষের মধ্যে যোগসূত্রের ভূমিকা পালন করে। মিশরে বিদেশি আক্রমণের তীব্র নিন্দা করে ভারত। জওহরলাল নেহরু একে 'নগ্ন আক্রমণ' বলে অভিহিত করেন। মিশরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং বিদেশি সৈন্য অপসারণের বিষয়ে আলোচনায় ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং ভারত জাতিপুঞ্জের শান্তিরক্ষাকারী বাহিনী হিসাবে মিশরে সেনা পাঠান।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন