কোরিয়া যুদ্ধ:
পটভূমি:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর কোরিয়া উপদ্বীপ একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। দীর্ঘদিন জাপানের উপনিবেশ থাকাকালীন কোরিয়ার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। ১৯৪৫ সালে জাপানের পরাজয়ের পর কোরিয়াকে সাময়িকভাবে ৩৮° অক্ষরেখা বরাবর দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়—উত্তর অংশে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ অংশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সাময়িক বিভাজনই ধীরে ধীরে স্থায়ী রাজনৈতিক বিভাজনে রূপ নেয়।
উত্তর কোরিয়ায় সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আদর্শ ও সহযোগিতা কার্যকর ছিল। অপরদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় পুঁজিবাদী ও গণতান্ত্রিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায়। উভয় কোরিয়াই নিজেদেরকে সমগ্র কোরিয়ার একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করায় উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। এই প্রেক্ষাপটে স্নায়ুযুদ্ধের আদর্শগত সংঘাত কোরিয়া উপদ্বীপে সরাসরি সংঘর্ষের পথ তৈরি করে।
কারণ:
[1] রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়। ফলে জাপান অধিকৃত কোরিয়ার উত্তরাংশ রাশিয়ার কাছে এবং দক্ষিণাংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এসময় থেকে কোরিয়ার ৩৮° উত্তর অক্ষরেখার উত্তরাংশে রাশিয়া এবং ৩৮° উত্তর অক্ষরেখার দক্ষিণাংশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
[2] অস্থায়ী কমিশনের ব্যর্থতা : কোরিয়ার সমস্যা নিয়ে মস্কোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। (১৯৪৫ খ্রি., ডিসেম্বর)। এই বৈঠকে উভয় রাষ্ট্র এক যুগ্ম কমিশন গঠনের কথা বলে। এই কমিশনের নেতৃত্বে কোরিয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এক অস্থায়ী স্বাধীন সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এই উদ্যোগ শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
[3] কোরিয়ায় দুই সরকার প্রতিষ্ঠা : অস্থায়ী কমিশনের উদ্যোগ ব্যর্থ হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়ার সমস্যাকে জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভায় উত্থাপন করে। সাধারণ সভা তার ৯টি সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে একটি অস্থায়ী কমিশন (United Nations Temporary Commission on Korea বা UNTCOK) গঠন করে। এই কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্তি হন বিশিষ্ট ভারতীয় কূটনীতিবিদ কে. পি. এস. মেনন। এই কমিশনের ওপর কোরিয়ায় জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দেওয়া হয় । কিন্তু রাশিয়া জাতিপুঞ্জের সদস্যদের উত্তর কোরিয়ায় প্রবেশ করতে দেয়নি। তাই জাতিপুঞ্জের তত্ত্বাবধানে দক্ষিণ কোরিয়ায় নির্বাচনের (১০ মে, ১৯৪৮ খ্রি.) মাধ্যমে এক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়। মার্কিন প্রভাবিত এই সরকারের প্রধান হন সিংম্যান রি (১৯৪৮ খ্রি., ১৫ আগস্ট)। ঠিক একই সময়ে উত্তর কোরিয়াতেও কমিউনিস্ট নেতা কিম- ইল-সুঙের নেতৃত্বে সোভিয়েত প্রভাবিত একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
[4] দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর উত্তর কোরিয়ার আক্রমণ : জাতিপুঞ্জের অস্থায়ী কমিশন এবং নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়াকে আক্রমণকারী বলে চিহ্নিত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিপুঞ্জ দক্ষিণ কোরিয়ার পাশে দাঁড়ালে রাশিয়া ও চিন উত্তর কোরিয়ার পক্ষ নেয়। ফলে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ বাধে।
যুদ্ধের ধাপসমূহ:
কোরিয়া যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৫০ সালের ২৫ জুন, যখন উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনী হঠাৎ করে দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রমণ চালায়। প্রথম ধাপে উত্তর কোরিয়ার বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হয়ে সিউল দখল করে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনী প্রায় সম্পূর্ণভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই পর্যায়ে যুদ্ধ উত্তর কোরিয়ার পক্ষে ছিল।
দ্বিতীয় ধাপে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ ঘটে, মূলত মার্কিন নেতৃত্বে। দক্ষিণ কোরিয়াকে রক্ষা করার জন্য জাতিসংঘ বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করে। ইনচনের নৌ-অবতরণ অভিযানের মাধ্যমে জাতিসংঘ বাহিনী পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেয় এবং উত্তর কোরিয়ার সেনাদের ৩৮° অক্ষরেখার ওপারে ঠেলে দেয়।
তৃতীয় ধাপে চীনের হস্তক্ষেপ যুদ্ধের গতিপথ আবার পরিবর্তন করে। চীনা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিলে জাতিসংঘ বাহিনী পুনরায় দক্ষিণে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এর ফলে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী ও স্থবির রূপ নেয়।
শেষ ধাপে যুদ্ধ একটি অচলাবস্থায় পৌঁছায় এবং দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৫৩ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যদিও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তবুও কোরিয়া উপদ্বীপে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং বিভাজন অব্যাহত থাকে।
কোরিয়া যুদ্ধের ফলাফল :
কোরিয়া যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য আদৌ সফল হয়নি। এই যুদ্ধের ফলে —
- বিভাজন স্বীকার : বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দুই কোরিয়ার সংযুক্তি তো দূরের কথা, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিভাজনকেই মেনে নিতে হয়।
- মানবিক ও আর্থিক ক্ষতি : দীর্ঘস্থায়ী ওই যুদ্ধে দুই কোরিয়ারই প্রচণ্ড ক্ষতি হয়। মার্কিনি, কোরীয়, চিনা সব মিলিয়ে ২৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। উত্তর ও দক্ষিণ উভয় অঞ্চলেরই অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
- আমেরিকার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রস্তুতি : যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধের সুযোগে চিনকে দুর্বল করতে চাইলেও তা পারেনি। তাই তখন থেকে সে তার সামরিক বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করে গড়ে তোলার প্রস্তুতি নেয়।
- ঠাণ্ডা লড়াইয়ের বিস্তার : এই যুদ্ধের ফলে ঠান্ডা লড়াই সমগ্র প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন