সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সুয়েজ সংকট কেন দেখা দিয়েছিল?

সুয়েজ সংকট :


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকার মিশরে নিজেদের তাবেদার শাসক প্রতিষ্ঠা করে সেখানে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করলে, মিশরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ও ব্রিটিশ আধিপত্য বিরুদ্ধে আন্দোলন চলতে থাকে যখন জেনারেল নেগুইব মিশরের শাসনক্ষমতা দখল করেন। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে গামাল আবদুল নাসের মিশরের ক্ষমতা দখল করেন ১৯৫৪ সালে। দুবছর পর তিনি মিশরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

নাসের ক্ষমতা দখল করলে পশ্চিম শক্তিবর্গ সেটা ভালোভাবে মেনে নিতে পারে না। কারণ ব্রিটেন যখন ব্রিটেন সুয়েজ খালের রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্যে ওই অঞ্চলে সেনা মোতায়েনের সময় বৃদ্ধি করতে চায়, নাসির তার প্রতিবাদ জানায়। আফ্রিকায় অবস্থিত ফরাসি উপনিবেশ আলজিরিয়ায় ১৯৫৪তে বিদ্রোহ শুরু হলে নাসের বিদ্রোহীদের সাহায্য করেন। মধ্যপ্রাচ্যে রুশ আগ্রাসন প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে আমেরিকায় নেতৃত্বে ১৯৫৫ সালে বাগদাদ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে মিশর এই চুক্তি থেকে দূরে থাকে। পশ্চিমি জোট এতে অসন্তুষ্ট হয়। মধ্যপ্রাচ্যে আরব জাতীয়তাবাদের বিরোধী ইজরায়েল উত্থান মেনে নিতে পারেননি।পশ্চিম দেশের থেকে আর্থিক সহায়তা চেয়ে নাসের ব্যর্থ হয় এবং রাশিয়ার সাথে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।

১৯৬৯সালে সুয়েজখাল দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে জাহাজ চলাচল শুরু হয় ও 'Universal Suez Canal Company' এক চুক্তির ভিত্তিতে ১৯ বছরের মেয়াদে এই খাল পরিচালনার দায়িত্ব পায়। এর থেকে মিশর খুব সামান্য অংশ ভাগ পায়। খালের নিরাপত্তার জন্য ব্রিটিশ সেনা মেতায়েন থাকায় সুয়েজখাল ও নিকটবর্তী অঞ্চলে মিশরের কর্তৃত্ব ছিল না। নাসের নীলনদের ওপর Aswan Dam Project গ্রহণ করেন, কারণ ওই বাঁধ নির্মিত হলে মিশরের ৮,৬০,০০০ হেক্টর জমি আবাদযোগ্য হত এবং বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভবপর হত। ব্যয় আনুমানিক ১৪০০ মিলিয়ন ডলার ধার্য হয় এবং ইংল্যান্ড, আমেরিকা ও বিশ্বব্যাংক প্রাথমিকভাবে ৭০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে রাজি হয়। ১৯৫৬সালে জুলাই মাসে বিশ্বব্যাংক এই ঋণ প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। বাঁধ নির্মাণের জন্য জনরোষ দেখা দেয়। তখন নাসের সুয়েজখাল ও সুয়েজ ক্যানাল কোম্পানি জাতীয়করণ করার কথা ঘোষণা করেন। মনে করা হয়, খাল থেকে সংগৃহীত অর্থ বাঁধ প্রকল্পে ব্যয় হবে। কোম্পানির বিদেশি অংশীদারদের প্রচলিত বাজারদর অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক যোগসূত্র সব দেশের জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করতে পারবে। জাতীয়করণের কথা ঘোষণা করলে, অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। পশ্চিমি জোটের স্বার্থ বিপন্ন হয়ে পড়ে। যে সুয়েজখাল সংকট ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যার কারণে নাসেরকে অপসারণের জন্য মিশর আক্রমণ পশ্চিমদেশের লক্ষ্য হয়ে যায়। আমেরিকা চেয়েছিল সুয়েজ খালকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে আনতে। বলপ্রয়োগ করে মধ্যপ্রাচ্য ও তৃতীয়বিশ্বে আমেরিকা অসন্তোষ দেখা দিক সেটা চায়নি।

সুয়েজ খাল ব্যবহারকারী ২২টি দেশ নিয়ে লন্ডনে সম্মেলন ডাকা হলে, মিশর যোগ দিতে অসম্মতি জানায়। ১৮টি দেশ আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দিলে, ভারতসহ বাকি দেশ জাতীয়করণের পক্ষে মত দেয়। মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব জন ফস্টার ডালেস সুয়েজখাল ব্যবহারকারী সংস্থা গঠন করে, এই সংস্থার মাধ্যমে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেন। নাসের তখন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের কাছে এই সুয়েজ সমস্যার কথা পেশ করেন। জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ ব্রিটেন ও ফ্রান্স সুয়েজখালের ওপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের কথা বলে। নাসেরের আপত্তি ও সোভিয়েত রাশিয়ার 'ভেটো' প্রয়োগের ফলে এই প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। অবশেষে গোপন পরিকল্পনা অনুযায়ী ইজরায়েল ২৯শে অক্টোবর ১৯৫৬ মিশর আক্রমণ করে।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অবশিল্পায়ন কি ? ঔপনিবেশিক ভারতে অবশিল্পায়নের কারণ ও ফলাফল লেখো ।

অবশিল্পায়নঃ        অবশিল্পায়ন বলতে বোঝায় শিল্পায়নের বিপরীত বা শিল্পের অধোগতি। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনধীন ভারতের চিরাচরিত ও ঐতিহ্যশালী হস্তশিল্প-কুটিরশিল্পের ধ্বংস সাধনই মূলত অবশিল্পায়ন। সব্যসাচী ভট্টাচার্যের মতে যদি দেশের মানুষ শিল্প-কর্ম ছেড়ে চাষ-আবাদে জীবিকা অর্জন শুরু করে অথবা জাতীয় কৃষিজ ও অংশ বাড়তে থাকে এবং শিল্পজ অংশ কমতে থাকে তাকে অব-অবশিল্পায় বলে। অবশিল্পায়নের ফলে ভারতের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতের অবশিল্পায়ন সম্পর্কে প্রথম পর্বে দাদাভাই নাও রোজি, রমেশ চন্দ্র দত্ত, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে প্রমুখ জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনীপাম দত্ত জাতীয়তাবাদী নেতা এবং পরবর্তীকালে রজনী পামদত্ত, গ্যাডগিল, বি.ডি. বসু, নরেন্দ্রকৃয় সিংহ, বিপান চন্দ্র, অমিয় বাগচি প্রমুখ ঐতিহাসিক আলোচনা করেছেন। অব-শিল্পায়নের কারণঃ (১) কাঁচামালের রপ্তানি: ভারতীয় শিল্পের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে ভারত থেকে ইংল্যান্ডে কাঁচামাল রপ্তানি শুরু হয়। ভারত ইংল্যান্ডের কলকারখানার খোলা বাজার ও কাঁচামাল সরবরাহের উৎসে পরিণত হয়। ভারত থেকে তুলো, নীল, কফি, চা, রেশম প্রভৃতি ইং...

জোটনিরপেক্ষ নীতি কী ? জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব লেখো।

জোটনিরপেক্ষ নীতিঃ     দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে একদিকে সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী বা সমাজতান্ত্রিক জোট, অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রজোট গঠিত হয়। এই দুই জোটের কোনোটিতেই যোগ না দিয়ে, স্বাধীনভাবে উভয় জোটের সঙ্গেই বন্ধুত্ব বা সমদূরত্ব বজায় রেখে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বৈদেশিক সম্পর্ক পরিচালনার নীতি জোটনিরপেক্ষ নীতি নামে পরিচিত। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের কারণ বা উদ্দেশ্য ঃ    মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী জোট ও সোভিয়েত নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী জোটের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত ‘ঠান্ডা লড়াই'-এর আর্বত থেকে নিজেকে দূরে রেখে, জাতীয় স্বার্থ ও নবলব্ধ স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য ভারত জোটনিরপেক্ষ বিদেশনীতি গ্রহণ করে। ভারতে জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের কারণগুলি হল— [1] ভৌগোলিক সুরক্ষা : এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে এমন একটা জায়গায় ভারতের অবস্থান যা তাকে মধ্যপ্রাচ্য। ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী দেশে পরিণত করেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চিন, ব্রহ্মদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশি...

চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপ সম্পর্কে আলোচনা করো।

অথবা, রাজরাজ ও প্রথম রাজেন্দ্র চোলের নেতৃত্বে নৌ সাম্রাজ্যের বিস্তারের ইতিহাস লেখো। চোল রাজাদের সামুদ্রিক কার্যকলাপঃ       প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে চোল যুগ সামুদ্রিক কার্যকলাপের জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। রাজরাজের শাসনকাল থেকে প্রথম কুলোতুঙ্গের শাসনকাল পর্যন্ত প্রায় ১৩৫ বছর চোল রাজারা সামুদ্রিক সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান। ঐতিহাসিক পানিক্করের মতে, প্রাচীন ভারতের শুধু চোল রাজারাই সামুদ্রিক শক্তির বিস্তারে উৎকর্ষ দেখিয়েছিলেন। চোল রাজাদের নৌ সাম্রাজ্য বিস্তারের পিছনে বাণিজ্যের বিস্তার, উপনিবেশ স্থাপন, আরব আক্রমণ প্রতিহত করা প্রভৃতি বিষয়গুলি মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।        রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল পিতা-পুত্র চোলদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় চোল ইতিহাস শতাব্দীকাল ব্যাপী ভারতের ইতিহাসে এক গৌরবজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। চোল রাজ্য ছিল একটি ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাজ্য, যাকে রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোল ভারতের মূল ভূখন্ড ছাড়িয়ে তাদের নৌবহরের দাপটে বঙ্গোপসাগরকে এক বিরাট সামুদ্রিক সাম্রাজ্যে পরিণত করে। তাই বলা যায় তার...

১৫২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল-আফগান দ্বন্দ্বের বিবরণ দাও।

মুঘল-আফগান দ্বন্দ্ব:      ভারতে মুঘল শক্তির উত্থান ও বিকাশের সঙ্গে মুঘল আফগানি দ্বন্দ্বের সমান্তরাল অবস্থান দেখা যায়। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘল আফগান দ্বন্দ্ব চলতে থাকে।      খানুয়ার যুদ্ধ: ১৫২৭ খ্রিস্টাব্দে মেবারের রানা সংগ্রাম সিংহের সঙ্গে বাবরের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। যুদ্ধে রানা সংগ্রাম সিংহ পরাজিত হন। এই যুদ্ধে রাজপুতদের সঙ্গে আফগানরা সহযোগিতা করেনি। রাজপুতদের সঙ্গে সঙ্গে আফগানরাও যদি মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করত তাহলে হয়ত ভারতের ইতিহাসের গতি অন্য পথে প্রবাহিত হতে পারত।     ঘর্ঘরার যুদ্ধ (১৫২৯ খ্রিস্টাব্দ): বাবর আফগানদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়ে বিহারের সীমান্তে পৌঁছান। পূর্ব ভারতে মুঘল আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য জৌনপুরের শাসনকর্তা মামুদ লোদি বিহারের আফগান নেতা শেরশাহ, এবং বাংলার সুলতান মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে সম্মিলিত ঐক্যশক্তি জোট গঠন করেন। বাবর নুসরৎশাহের কাছে দূত পাঠিয়ে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করতে বলেন। এর পর মামুদ লোদি, ও শেরশাহ মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বাবর এলাহাবাদ, বারাণসী দখল করে বিহারের আরো জেলা অধিকার করার জন্...

একজন ঐতিহাসিক হিসেবে আবুল ফজলের মূল্যায়ন করো ।

আবুল ফজল:       ভারতবর্ষে মুসলমান শক্তির উদ্ভব ও প্রতিষ্ঠা যেমন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন প্রবণতার সৃষ্টি করেছিল, তেমনি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও নতুন এক যুগ বহন করে এনেছিল। মোগল যুগের ইতিহাসচর্চা বিশেষ করে দরবারী ইতিহাসের শ্রেষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন আবুল ফজল। আকবরের মন্ত্রী, বন্ধু, রাষ্ট্রনেতা, কূটনীতিবিদ ও সামরিক অফিসার আবুল ফজল ইতিহাস রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। শৈশবেই তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে ছিলেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি জ্ঞানার্জনের সমস্ত শাখায় দক্ষতা লাভ করেন। নির্যাতিত ও অত্যাচারিত পরিবারের দুর্ভাগ্য আবুল ফজলের চিন্তার উপর গভীর ছাপ ফেলেছিল। মোগল সম্রাট আকবরের আশ্রয় ও পৃষ্টপোষকতা লাভ করার পর তিনি রচনা করেন দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ-‘আকবরনামা’ ও ‘আইন-ই-আকবরী’।         মধ্যযুগের ভারতের ঐতিহাসিকদের মধ্যে আবুল ফজল ছিলেন সবচেয়ে প্রতিভাবান। ‘আকবরনামা’-র দ্বিতীয় খন্ডে তিনি ইতিহাস ও ইতিহাস তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর মতামত রেখেছেন। পূর্বসূরীদের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গীর সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি বলেছেন, ‘এদের কাছে ইতিহাস হল মুসলমানদের ভারত জয়, শাসন এবং হিন...